বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১, ২০২২ ||

তথাগত অনলাইন |বুড্ডিস্ট নিউজ পোর্টাল

প্রকাশের সময়:
মঙ্গলবার ২৪ জানুয়ারী ২০২২

243

রুনা বন্দ্যোপাধ্যায়

বৌদ্ধ তীর্থ সারনাথ

প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার ২৪ জানুয়ারী ২০২২

243

রুনা বন্দ্যোপাধ্যায়

বৌদ্ধ তীর্থ সারনাথ

বৌদ্ধ শাস্ত্রমতে সারনাথ হল চারটি বৌদ্ধ তীর্থস্থানের অন্যতম । প্রথমটি লুম্বিনী, গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান । দ্বিতীয়টি হল বুদ্ধগয়া, যেখানে বুদ্ধের সম্যক জ্ঞানলাভ, তথা বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি । তৃতীয় সারনাথ, বৌদ্ধধর্ম এবং বৌদ্ধসংঘের জন্মস্থান । চতুর্থ কুশিনগর, যেখানে ভগবান বুদ্ধ মহানির্বাণ লাভ করেন । সারনাথের মিউজিয়ামে রক্ষিত একটি পাথরে পর পর খোদিত এই চারটি তীর্থস্থানের উল্লেখ পাওয়া যায় । অশোক বৃক্ষের মাঝখান দিয়ে ধামেকা স্তুপের পথ জাতকের গল্পে উল্লেখ আছে পঞ্চম ও ষষ্ঠ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে ষোলটি মহজনপদের মধ্যে বারাণসী একটি উল্লেখযোগ্য মহজনপদ, যার রাজধানী ছিল ঋষিপতন মৃগদাব । সংস্কৃতে ঋষিপতন মৃগদাব পালিতে উচ্চারিত হয় ইষিপতন মৃগদাব নামে । মহাভস্তু নামে বৌদ্ধ গ্রন্থে এই নামকরণের উত্সের সন্ধান পাওয়া যায় । কাশী থেকে প্রায় দুই ক্রোশ দূরে ছিল এক মৃগদাব । প্রায় পাঁচশ জন 'প্রত্যেক বুদ্ধ' এখানে বসবাস করেছেন । বৌদ্ধশাস্ত্রমতে যাঁদের সম্যক জ্ঞানলাভ অর্থাৎ বুদ্ধত্ব লাভ হয়নি তাঁদেরকেই বলা হত 'প্রত্যেক বুদ্ধ'। এই ঋষিগণের নির্বাণ লাভ তথা 'পতন' থেকেই এই মৃগদাবের নাম ঋষিপতন । বৌদ্ধধর্মের শেষপর্বে যখন হিন্দুরা বৌদ্ধধর্মের বিনাশে মেতে উঠেছিল, তখন প্রত্যেক বৌদ্ধবিহার ধ্বংস করে সেখানে একটি করে শিবের মন্দির তৈরি করা হত । সম্ভবত: ঋষিপতন মৃগদাবের বৌদ্ধবিহার ধ্বংস করে সেখানে সারঙ্গনাথের মন্দির স্থাপিত হযেছিল । বাম হস্তে মৃগ ধারণ করা শিবের মূর্তিকেই সারঙ্গনাথ বলা হয়ে থাকে । আর সেই সংস্কৃত সারঙ্গনাথ থেকেই কালক্রমে প্রাকৃতে সারনাথ নামকরণ । বর্তমান সারনাথে এখনও একটি জলের ট্যাঙ্কের নাম সারঙ্গতালাব । ইষিপতন মৃগদাব নামের আড়ালে একটি সুন্দর গল্প কথিত আছে । মৃগদাব এবং মৃগদায় এই দুটি শব্দই পাওয়া যায় পালি ভাষার অভিধানে । মৃগদায় শব্দের অর্থ মৃগকে দেওয়া হয়েছে এমন । কথিত আছে রোহিত নামে এক মৃগরাজ প্রায় ১০০০ মৃগ নিযে এখানকার জঙ্গলে বসবাস করতেন । বৃদ্ধ হলে তিনি তাঁর দুই সন্তান ন্যগ্রোধ এবং বৈশাখের হাতে এই মৃগকুলের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তুলে দেন । তত্কালীন বারাণসীর রাজা ব্রহ্মদত্ত প্রতিদিন সেই জঙ্গলে মৃগয়ায় আসতেন । যত মৃগ তিনি বধ করতেন তার বহুগুণ বেশি আহত হত এবং গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করে মৃত্যুর পর ঈগলের খাদ্যে পরিণত হত । মৃগরাজ ন্যগ্রোধ এবং তাঁর ভাই বৈশাখ এই নির্মম হত্যা বন্ধ করার প্রয়াসে রাজা ব্রহ্মদত্তের নিকট প্রার্থনা জানালেন, মহামান্য রাজা, আপনার রাজ্যে যেমন গ্রাম ও শহরগুলি মানুষ এবং গৃহপালিত পশুর সম্ভারে সজ্জিত, তেমনি এই জঙ্গল নদী, ঝরনা, পাখি আর মৃগের দ্বারা শোভিত । আপনি মহান রাজা । আপনার রাজত্বে শহরগুলির মতই জঙ্গল রক্ষণাবেক্ষণের দায়ও আপনার । তাই আমাদের প্রার্থনা, আপনি যদি দয়া করে মৃগয়া বন্ধ করেন তবে আমরা প্রতিদিন আপনার দরবারে একটি করে মৃগ উপঢৌকন পাঠাবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি । ব্রহ্মদত্ত ন্যগ্রোধের প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন । নিয়মের চাকা একদিন ঘুরে এসে দাঁড়ালো এক গর্ভবতী মৃগমায়ের সামনে । মৃগরাজের কাছে সে অনুরোধ করল সন্তানের জন্মপর্যন্ত তাকে সময় দেওয়া হোক । তখন ন্যগ্রোধ অন্যান্য মৃগদের আহ্বান করলেন, কিন্তু কেউ রাজি হল না রাজার খাদ্যে পরিণত হতে । তখন ন্যগ্রোধ আপন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার জন্য নিজেই রাজার নিকট যেতে মনস্থ করলেন । বারাণসীর রাজপথ দিযে রাজদরবারে যাওয়ার পথে সমস্ত নগরবাসীও মৃগরাজের অনুসরণ করতে লাগল এবং রাজার নিকট ন্যগ্রোধের আত্মোত্সর্গের কাহিনি তুলে ধরে মৃগের প্রাণভিক্ষা চাইল । নিজের আশ্রিত মৃগের প্রাণ রক্ষার জন্য আপন প্রাণ বিসর্জন দিতেও কুন্ঠাবোধ করে না দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন রাজা ব্রহ্মদত্ত । নিজের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হলেন । মৃগরাজের কতৃত্বে ছেড়ে দেওয়া হল ওই জঙ্গল যাতে সমস্ত মৃগ নির্ভয়ে বসবাস করতে পারে এবং জঙ্গলে মৃগয়া করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিলেন । সেই "মৃগকে দেওয়া হল" থেকেই মৃগদায় নামের উত্পত্তি । তাই 'মৃগদায়' এবং মৃগদাব দুটো নামেরই উল্লেখ পাওয়া যায় । ধামেকা স্তুপ বর্তমান বেনারস থেকে স্থলপথে ১০ কিলোমিটার উত্তরে সারনাথে পৌঁছলে যেটি সর্বপ্রথম চোখে পড়ে তা হল ধামেকা স্তুপ । উচ্চতা প্রায় ১১২ ফুট এবং ৯৩ ফুট ব্যাসের এই বিরাট স্তুপটি তৈরি করেছিলেন সম্রাট অশোক, সপ্তম শতাব্দীতে । নিচের পীঠশিলা থেকে ৩৭ ফুট পযন্ত স্তুপের নির্মাণ পাথরের এবং বাকি অংশ ইঁটের তৈরি । স্তুপটিকে ঘিরে তার গায়ে আটটি বড় শেল্ফ গাঁথা আছে, যেখানে বুদ্ধমূর্তি রাখা ছিল বলে অনুমান করা হয় । ধামেকা স্তুপের অলঙ্করণ স্তুপের নিচের দিকে আছে মনোরম অলঙ্করণ, যা আজও বেনারসী সিল্ক শাড়ির ডিজাইনে ব্যবহৃত হয় । এই ধামেকা স্তুপটিই সেই পবিত্র স্থান বলে উল্লিখিত হয়েছে, যেখানে বুদ্ধদেব পঞ্চভার্গব ভিক্ষুকে প্রথম ধর্মচক্রপ্রবর্তন সূত্র ব্যাখ্যা করেছিলেন । বুদ্ধগয়ায় বোধিসত্ত্ব লাভ করার পর গৌতম বুদ্ধ তা প্রচার করার জন্য পঞ্চভার্গব ভিক্ষুর সন্ধানে প্রথম এসে পৌঁছলেন সারনাথে । তিনি যখন শ্রমণ গৌতম, নিরঞ্জনা নদীর তীরে মানুষের মুক্তির সন্ধানে রত, তখন পঞ্চভার্গব ভিক্ষু কোদন্য, বাপ্পা, ভদ্ব, মহানামা এবং অশ্বজিৎ তাঁর সতীর্থ ছিলেন । কিন্তু সিদ্ধার্থ যখন কঠোর তপশ্চর্যার পথ ত্যাগ করে দেহকে নিপীড়ন করা বন্ধ করলেন এবং বিষয়ে পরিমিত আহার-নিদ্রাকে বরণ করলেন তখন এই পাঁচ ভিক্ষু তাঁকে ব্রাত্য ভেবে ত্যাগ করেন । পরমজ্ঞান লাভ করার পর বুদ্ধদেব যখন সদ্ধর্মের প্রথম প্রচার করার জন্য কাশী অভিমুখে যাত্রা করলেন তখন পঞ্চভার্গব ভিক্ষু সারনাথে । ভিক্ষু গৌতমের সারনাথে আসার সংবাদ পেলে তাঁরা ঠিক করলেন তাঁকে অভিবাদন করবেন না । কিন্তু সিদ্ধার্থ তাঁদের সমীপবর্তী হলে তাঁরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখলেন, তাঁরা পাঁচজনেই সিদ্ধার্থকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছেন । কিন্তু সেখানেই বিস্ময়ের শেষ হল না । গৌতম বুদ্ধ আসন গ্রহণ করলে ভিক্ষুগণ যখন তাঁকে শ্রমণ গৌতম বলে সম্বোধন করলেন, তিনি বললেন, -না, আমি আর গৌতম নই । সম্যক জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে আমি এখন তথাগত বুদ্ধ । সংঘারাম এই সারনাথ মৃগদাবেই বুদ্ধদেব প্রথম উচ্চারণ করলেন তাঁর সদ্ধর্মের মূল বাণী । আবর্তিত হল সর্বপ্রথম মহাধর্মচক্র । ইন্দ্রিয়জ সুখ সন্ধান এবং ইন্দ্রিয় নিপীড়ন এই দুই চরম পথ পরিত্যাগ করে মধ্যপথ অবলম্বন করতে হবে । জ্ঞানের পথই সেই মধ্যপথ । অষ্টাঙ্গিক সত্যমার্গ । সম্মা-দিঠট বা সত্য দৃষ্টি, সম্মা-সঙ্কপ্পো বা সত্য সংকল্প, সম্মা-বাচা বা সত্য বাক্য, সম্মা-কম্মন্তো বা সৎ কর্ম, সম্মা-আজীবো বা সৎ জীবিকা, সম্মা-বায়ামো বা সৎ উদ্যোগ, সম্মা-সতি বা সৎ চিন্তা, সম্মা-সমাধি বা সৎ ধ্যান । পঞ্চভার্গব ভিক্ষুকে তিনি ব্যাখ্যা করে বললেন, বন্ধন দু:খ কী ? বন্ধন দু:খের মূল কারণ কী ? এবং বন্ধন দু:খের মূলোত্পাটনের উপায় কী ? জন্ম, ব্যাধি, জরা, মৃত্যুই হল সেই বন্ধন । এই বন্ধনজাত দু:খই বন্ধন দু:খ । ইন্দ্রিয়জ সুখের কামনা, আত্মতৃপ্তির বাসনা এবং অহংবোধজাত যশের আকাঙক্ষাই বন্ধন দু:খের মূল । তাই কামনা বাসনাকে নি:শেষে পরিত্যাগ করাই বন্ধন দু:খের মূলোচ্ছেদের উপায় যা অষ্টমার্গের পথেই সম্ভব । এভাবেই জাগতিক দু:খের হাত থেকে মানুষের মুক্তির সন্ধান দিলেন তথাগত । বুদ্ধের মুখে অষ্টমার্গের বিশ্লেষণ শুনে পঞ্চভার্গব ভিক্ষু অভিভূত হলেন । মনে হল মানুষের দু:খের মূল এমন করে এর আগে কেউ ব্যাখ্যা করেননি । নতুন যুগের বার্তা নিয়ে শুরু হল বৌদ্ধধর্ম । সারনাথেই প্রথম প্রতিষ্ঠিত হল বৌদ্ধসংঘ । মৌর্যযুগে অশোকের আমল থেকে সারনাথের বৈভব শুরু হয় । সপ্তম শতাব্দীতে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের তথ্যে সারনাথে সম্রাট অশোকের তৈরি ৩টি মনুমেন্টের উল্লেখ আছে, অশোক স্তম্ভ, বৌদ্ধ বিহার এবং ধর্মরাজিকা স্তুপ । ১১০ ফুট ব্যাসের পীঠশিলার ওপর তৈরি হয়েছিল এই স্তুপটি । স্তুপের অস্তিত্ব বিলোপ হলেও পীঠশিলাটি আজও বিদ্যমান । ধর্মরাজিকা স্তুপের পীঠশিলা ধর্মরাজিকা স্তুপের ভেতর সবুজ মূল্যবান পাথরে তৈরি একটি বাক্সে মণিমুক্তো ও সোনার পাতের সঙ্গে বুদ্ধের অস্থি সংরক্ষিত ছিল । কিন্তু ১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বারাণসীর হিন্দু রাজা চেতসিং-র দেওয়ান জগত্সিং নিজের নাম অক্ষয করার আকাঙক্ষায বারাণসীতে নিজের নামাঙ্কিত জগত্গঞ্জ মহল্লা তৈরি করলেন এবং ধ্বংস করলেন সারনাথের ধর্মরাজিকা স্তুপ । জগত্গঞ্জ মহল্লা তৈরির সমস্ত পাথর আসে ধর্মরাজিকা স্তুপ ভেঙে । স্তুপের ভেতর সংরক্ষিত মূল্যবান পাথরগুলি তিনি আত্মসাৎ করেন এবং অস্থিগুলি নিক্ষেপ করেন গঙ্গায় । বৌদ্ধবিহারের অংশবিশেষ ১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দে জেনারেল কানিংহামের নেতৃত্বে সারনাথে শুরু হয় প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান । এই সময়ে আবিষ্কৃত কিছু শিলালিপি থেকে জানা যায় ধর্মরাজিকা স্তুপ ষষ্ঠ শতকের তৈরি । স্তুপ ছাড়াও অসংখ্য মূর্তি আবিষ্কৃত হয় সারনাথে । বৌদ্ধ বিহারের একটি ঘরের মধ্যে প্রায় ৬০টি মূর্তি একত্রে পাওয়া যায় । সম্ভবত: মৌর্য বংশের পতনের পর হিন্দু রাজা পুষ্যমিত্র সুঙ্গের বুদ্ধবিদ্বেষের ভয়ে বৌদ্ধ শ্রমণগণ এই সমস্ত মূর্তিগুলিকে অসম্মানের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য একটি ঘরের মধ্যে সংরক্ষণ করেন । কানিংহামের তত্ত্বাবধানে ৬০টি মূর্তি স্থানান্তরিত করা হয় কলকাতার মিউজিয়ামে এবং বাকিগুলি নিক্ষেপিত হয় বরুণা নদীর ওপর ডানকান ব্রিজ তৈরির কাজে ! প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আবিষ্কৃত হয়েছে সম্রাট অশোকের আমলে তৈরি মনোলিথিক রেলিং । প্রায় ২.৫ মিটার লম্বা এবং ১.৫ মিটার উচ্চতার এই রেলিংগুলি চুনার বালিপাথরের তৈরি মনোলিথিক ব্লক । এদের অদ্ভুত সুন্দর পালিশ আজও অক্ষত । ধর্মরাজিকা স্তুপকে ঘিরে ছিল এই রেলিংগুলির অবস্থান । বুদ্ধের প্রথম উপাসকের একটি সুন্দর গল্পের উল্লেখ পাওয়া যায় বৌদ্ধশাস্ত্রে । বারাণসীর রাজার কোষাধ্যক্ষের পুত্র যশ অগাধ বিত্তবৈভবের মধ্যে নিমজ্জিত ছিলেন । গ্রীষ্ম, বর্ষা আর বসন্তের দিনযাপনের জন্য ছিল তাঁর তিনটি পৃথক অট্টালিকা । একবার বর্ষাকালীন প্রাসাদে সংগীত পটিয়সীদের সান্নিধ্যে দিন কাটাচ্ছেন । প্রায় চারমাস অতিবাহিত হলে এক রাত্রে হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখলেন, তাঁর লীলাসঙ্গিনীরা যে যেমনভাবে ছিল সেই ভাবেই ঘুমিযে পড়েছে । কারো হাতে মৃদঙ্গ, কারো হাতে বীণা আবার কারো বা খোলা মুখ থেকে লালা নি:সরণ হচ্ছে, কেউ বা নাসিকাধ্বনি করছে । লাস্যময়ীদের এই ঘুমন্ত রূপ দেখে তাঁর বিবমিষা উপস্থিত হল । ভোগ-সর্বস্য জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি ঘর ছাড়লেন । বারাণসীর উত্তরে ইষিপতন মৃগদাবে উপস্থিত হয়ে দেখা পেলেন স্বয়ং বুদ্ধের । বুদ্ধ তাঁর সুকুমার হৃদযের সন্ধান পেয়ে সাদরে গ্রহণ করলেন, উদ্বুদ্ধ করলেন অষ্টমার্গের পথে । পুত্রের সন্ধানে এলেন পিতা । কিন্তু তিনিও বাঁধা পড়ে গেলেন বুদ্ধের অভূতপূর্ব দর্শনের জালে । আকৃষ্ট হলেন বৌদ্ধধর্মের অষ্টমার্গিক পথে । বুদ্ধ তাঁকে মার্গপ্রদর্শকের নির্দেশাবলী এবং তিনরত্ন "বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘ" প্রদান করলেন । কোষাধ্যক্ষ, তাঁর পরিবারের সকলে এবং বন্ধুরাও ত্রক্রমে ত্রক্রমে বুদ্ধের উপাসক হয়ে উঠলেন । কিছুদিন ব্রহ্মচর্য পালন করার পর বুদ্ধদেব যশকে প্রব্রজ্যা দিলেন । বৌদ্ধ মাইথোলজি অনুযায়ী এই কোষাধ্যক্ষ, যশের পিতাই হলেন বুদ্ধের প্রথম উপাসক । মূলগন্ধকুটি বিহার সারনাথের প্রধান বৌদ্ধবিহার ছিল মূলগন্ধকুটি বিহার । ধর্মরাজিকা স্তুপ থেকে প্রায় ১৮ ফুট দূরত্বে অবস্থিত এই বিহারে স্বয়ং বুদ্ধ বাস করেছিলেন । বৌদ্ধভক্তের অর্পিত ধুপ-দীপ আর ফুলে সর্বদা এই বিহার অপূর্ব সুগন্ধে ভরপুর থাকত । তাই এর নাম মূলগন্ধকুটি । সম্ভবত: শ্রাবস্তির গন্ধকুটি বিহার থেকে ভিন্ন করার জন্যই 'মূল' শব্দটির আগমন । সপ্তম শতাব্দীর চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের তথ্য অনুযায়ী ২০০ ফুট উচ্চতার মূলগন্ধকুটি বিহার ছিল সোনার চন্দ্রাতপে আচ্ছাদিত । প্রত্নতাত্ত্বিক খননে জানা যায় প্রায় ৬০ স্কোয়ার ফুট প্লটের ওপর বিস্তৃত ছিল এই বিহার এবং একে ঘিরে ছিল ৪০ ফুট চওড়া প্ল্যাটফর্ম । ১২০০ খ্রীষ্টাব্দে কনৌজের রাজা গোবিন্দচন্দ্রের বুদ্ধভক্ত স্ত্রী রানী কুমারদেবীর প্রায় ২৬টি শ্লোকের শিলালিপি পাওয়া যায় সারনাথে । রানী কুমারদেবী মূলগন্ধকুটি বিহারের সংস্কারসাধন করেন এবং ধর্মচক্রমুদ্রায় বুদ্ধের এক বিরাট অপরূপ মূর্তি তৈরি করেছিলেন । বৌদ্ধশাস্ত্রে এই মূর্তির উল্লেখ পাওয়া যায় । সারনাথের আরো একটি বিখ্যাত আবিষ্কার অশোক-স্তম্ভ । ইতিহাস বলে, বুদ্ধদেব তাঁর সারাজীবনে তাঁর শিষ্যদের নিকট ৮৪০০০ ধর্মসূত্রের ব্যাখ্যা দেন । এই সংখ্যা অনুযায়ী সম্রাট অশোক তাঁর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ৮৪০০০ অশোক স্তম্ভ নির্মাণ করেন । কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে এই স্তম্ভগুলির উদ্যাপন হত । সম্ভবত: সেই থেকেই এই তিথিতে দীপাবলী উত্সবের প্রবর্তন । সারনাথের অশোক স্তম্ভ কয়েক টুকরো খণ্ডে আবিষ্কৃত হয় । স্তম্ভের লায়ন ক্যাপিটালের মাথায় বসানো ছিল ৩২টি স্পোকযুক্ত এক বিরাট ধর্মচক্র । প্রায় অক্ষত লায়ন ক্যাপিটাল এবং ধর্মচক্রের খণ্ডগুলি সারনাথের মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে । ধর্মচক্রপ্রবর্তন মুদ্রায় বুদ্ধ সারনাথে আবিষ্কৃত বুদ্ধমূর্তিগুলির মধ্যে সর্বপ্রধান হল ১.৬ মিটার উচ্চতার ধর্মচক্রপ্রবর্তনের মুদ্রায় বুদ্ধমূর্তি । গুপ্তযুগের ভাস্কর্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন এই মূর্তি । চুনাপাথরের তৈরি এই মূর্তির জ্যোতির্বলয়ে আছে পদ্মের মনোরম কারুকার্য এবং দুটি ধর্মচক্রপ্রবর্তন মুদ্রায় বুদ্ধ বোধিসত্বের মূর্তি । বুদ্ধকে ঘিরে আছে দুটি সুন্দর মৃগমূর্তি এবং পঞ্চভার্গব ভিক্ষু, যাঁদের নিকট বুদ্ধ প্রথম ধর্মচক্রপ্রবর্তন সূত্র ব্যাখ্যা করেছিলেন । বুদ্ধের আসনটিও একটি ধর্মচক্র । গভীর জ্ঞান এবং শান্তির অপরূপ সহাবস্থান বুদ্ধমূর্তিটিকে বিশিষ্ট করেছে । এই মূর্তিটিকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপবিষ্ট বুদ্ধমূর্তি হিসেবে গণ্য করা হয় । নতুন মূলগন্ধকুটি বিহার রানী কুমারদেবীর পর দীর্ঘ ৭০০ বছর পরে শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ উপাসক আঙ্গারিকা ধর্মপালা আবার সারনাথের সংস্কার সাধন শুরু করেন । মহাবোধি সোসাইটির ডাইরেক্টর জেনারেল আঙ্গারিকা ধর্মপালা হনুলুলুর মেরি এলিজাবেথ ফস্টারের সহায়তায় ১৯২২ খ্রীষ্টাব্দে নতুন করে চুনার পাথরে মূলগন্ধকুটি বিহার নির্মাণ করেন । বর্তমান সারনাথের প্রধান দ্রষ্টব্য এই মূলগন্ধকুটি বিহার । নতুন মূলগন্ধকুটি বিহারের অবস্থান একটি বোধিবৃক্ষের পাশে । সম্রাট অশোকের কন্যা সংঘমিত্রা বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারের জন্য বুদ্ধগয়ার বোধিবৃক্ষের চারা রোপণ করেছিলেন শ্রীলঙ্কার অনুরাধাপুরে । বোধিবৃক্ষ আঙ্গারিকা ধর্মপালা সেই বোধিবৃক্ষের একটি শাখা স্থাপন করেছিলেন সারনাথে । এখনও দেশ বিদেশ থেকে বহু বৌদ্ধ ভিক্ষুর আগমন ঘটে এই বোধিবৃক্ষের পাশে । নতুন মূলগন্ধকুটি বিহারে বুদ্ধ বর্তমানের এই মূলগন্ধকুটি বিহার জাংআপানি চিত্রকর কসেটসু নাসুর আঁকা বুদ্ধের বহু চিত্রমালার সম্ভারে সজ্জিত । তথাগত বুদ্ধের জীবনের কাহিনিগুলি অপরূপ রঙ ও রেখায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে । সারনাথের ধর্মচক্রমুদ্রায় বুদ্ধ ছাড়াও এই ছবিগুলির বিষয়বস্তু লুম্বিনীতে বুদ্ধের জন্মকাহিনি, বুদ্ধগয়ায় বোধিসত্বলাভ এবং কুশিনগরের নির্বাণলাভ ইত্যাদি । লুম্বিনীতে বুদ্ধের জন্ম বুদ্ধের জন্মকাহিনি-চিত্রটিতে দেখা যাচ্ছে শিশু জন্মগ্রহণ করেই সপ্তপদ অগ্রসর হলেন । প্রতি পদে একটা করে স্থলপদ্ম ফুটে উঠছে । স্বর্গ থেকে নেমে এসেছেন দেবতাগণ । সমগ্র চিত্রটি যেন সগৌরবে ঘোষণা করছে তথাগত বুদ্ধের আগমন বাতা .র্‌। বুদ্ধগয়ায় বোধিসত্বলাভ বুদ্ধগয়ায় বৌধিবৃক্ষতলে তপস্যারত সিদ্ধার্থ, ভূমিস্পর্শমূদ্রায় । মার ও তার তিন লাস্যময়ী কন্যা তহ্ন, রতি ও রঙ্গ এবং মার-সৈন্যদল সন্ন্যাসীকে ঘিরে কাম, লোভ ও ভয় দিয়ে আক্রমণে রত । কিন্তু জিতেন্দ্রিয় সন্ন্যাসী নির্বিকার । অবশেষে সর্বংসহা ধরিত্রীর লজ্জায় শিহরণে পায়ের তলায় মাটি কেঁপে উঠেছিল । অবিচলিত রয়ে গেলেন জিতেন্দ্রিয় বুদ্ধ এবং পরাজিত হয়েছিল বাসনাসক্ত মার । কুশিনগরে বুদ্ধের নির্বাণলাভ বুদ্ধদেবের সেই বিখ্যাত মহাপরিনির্বাণ মূর্তি । দক্ষিণপার্শে মুখ করে মাথার নিচে হাত রেখে শায়িত বুদ্ধ । একসারি দেবতার মূর্তি, তাঁরা মহামানবকে সসম্মানে স্বর্গে আহ্বান জানাচ্ছেন । বুদ্ধের সম্মুখে একসারি ভক্তবৃন্দ, বেদনায় আপ্লুত । পদপ্রান্তে ভিক্ষু আনন্দ, যিনি বুদ্ধের কাছে শেষদান গ্রহণ করেছিলেন তাঁর ভিক্ষাপাত্র ও যষ্ঠি । ধর্মঘন্টা নতুন মূলগন্ধকুটি বিহারের নিকট একটি বিশাল ধর্মঘন্টা আছে তথাগত বুদ্ধ, সমস্ত বোধিসত্ত এবং অর্হত্গণের উদ্দেশ্যে বৌদ্ধভক্তের আকুল প্রার্থনা পৌঁছে দেবার জন্য । যতবার এই ধর্মঘন্টা বাজবে ততবার বিশ্বশান্তির প্রার্থনা মন্দ্রিত হবে । ধর্মঘন্টার শব্দতরঙ্গে শান্তি ও মৈত্রীর বাণী প্রসারিত হোক দিকে দিকে ।