বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী ৯, ২০২৩ ||

তথাগত অনলাইন |বুড্ডিস্ট নিউজ পোর্টাল

প্রকাশের সময়:
শুক্রবার ১৮ নভেম্বর ২০২২, ,৯ টা

প্রতিবেদন

সংঘরাজ , শাসন শোভন ড. জ্ঞানশ্রী মহাথের'র ৯৮ তম জন্মবার্ষিকী আজ

প্রকাশের সময়: শুক্রবার ১৮ নভেম্বর ২০২২, ,৯ টা

প্রতিবেদন

সংঘরাজ , শাসন শোভন ড. জ্ঞানশ্রী মহাথের'র ৯৮ তম জন্মবার্ষিকী আজ

আজ ১৮ নভেম্বর । বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার ত্রয়োদশ সংঘরাজ , শাসন শোভন ড. জ্ঞানশ্রী মহাথের'র ৯৮ তম জন্মবার্ষিকী ।
১৯২৫ সালে এদিনে চট্টগ্রাম জেলাধীন রাউজান থানার অন্তর্গত উত্তর গুজরা ডোমখালী গ্রামে।

সমাজ সদ্ধর্ম পরিমন্ডলে কাল পরিক্রমায় কিছু কিছু বিরল ব্যক্তিত্ব বিদগ্ধ অনুভাবকের দেখা মেলে যারা নিজেদের জ্ঞান-পূত আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দূর করেন সমাজের অজ্ঞানতার অন্ধকার, আলোকিত করেন চারপাশ, মোহমুক্ত করেন মানুষকে,সবার সামনে খুলে দেন আলোকজ্জ্বল এক উদ্বেলিত এবং মহাজীবনের ঠিকানা। পৃথিবী পৃষ্ঠের চমৎকার সবগুলো সৃষ্টির মাঝে মানুষের নিরন্তর আসা যাওয়া অপূর্ব তো বটে,যাঁরা গভীরভাবে এই আসা যাওয়াকে অবলোকন করেছেন তাদের অন্তরে হয়েছে ভাবোদয় এবং তার থেকে জন্ম নিয়েছে বৈরাগ্য।সহস্র কোটি এ আসা যাওয়ার অন্তরালে নিত্যদিন হারিয়ে যাচ্ছে কত,আবির্ভূত হচ্ছে কত তার হিসাব না থাকলেও এমন কিছু মহান প্রাণের হিসাব মেলে যাঁদের আত্মত্যাগ আর জীবন ধারণের আদর্শ হয়ে থাকে অবিরাম এ আসা যাওয়ার মাঝে বাকীদের পথ নির্দেশনা।তেমন মহান ব্যক্তির সংখ্যা খুব বিরল হলেও তাঁদের জীবনালেখ্য হয়ে থাকে সময়ের সীমারেখা।যে মহান ব্যক্তির জীবন ধারার প্রতি এখানে বর্ণনা করা হচ্ছে তাঁর জীবনের আদর্শ ও আত্মত্যাগের মহিমা বাংলাদেশের বৌদ্ধ জনগণ,বুদ্ধের শাসন সর্বোপরি মানব কল্যাণে সমুজ্জ্বল। নিবৃতচারী প্রাতঃস্মরণীয় এই মহামনীষী হলো ধর্ম সমাজ জনকল্যাণের বহু প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, অনাথের নাথ,বিনয়াচার্য,১৩তম সংঘরাজ জ্ঞানশ্রী মহাথেরো মহোদয় যিনি মিতভাষী,স্মিতহাস্য,সৌম্য দর্শন,স্থিরবুদ্ধি,বহুদর্শী,কল্যাণকামী ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তিত্ব সে দিনের লোকনাথ বড়ুয়া।
----ঃজন্ম ও শৈশবঃ---
হালদার কূলে কূলে,পাল তোলা নৌকার কাছ থেকে ভেসে আসা ভাটিয়ারী গানের সুরে সুরে,¯্রােতস্বিনীর ঢেউ এর মৃদু নিনাদ সান্ধ্যকালীন পাখির কুজনে মুখরিত অথচ আধুনিক পুর সজ্জায় নিরাভরণ ঐতিহ্যবাহী রাউজান উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম ডোমখালী যেই গরবিনী প্রসবিনীর আর্তনাদে ঘোষনা করেছিল,“আমি ধারণ করছি এমন এক সন্তান--সে লোকনাথ,সে লোকনাথ,সে লোকনাথ।” তখন ছিল ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই নভেম্বর রোজ বুধবার,২রা অগ্রহায়ন ১৩৩২ বঙ্গাব্দ। শিশু লোকনাথ হেসে খেলে প্রাণ চঞ্চল মাতৃদেবী মেনকার কোলে, পিতা প্রেমলাল সাধু সজ্জন অতি যতœ ভরে কর্তব্য নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছিলেন পুত্র সন্তানের লালন পালনের দায়িত্ব বহন করে।ডোমখালীর নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সেই শিশু লোকনাথ শৈশবের পায়ে ভর দিয়ে বাল্যে উপনীত হতেই তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেন স্নেহময়ী মাতার কোল,উঞ্চ পরশ আর হৃদয়ের উত্তাপ। কী জানি কেন প্রসংগত দেখা যায় এমনটি প্রায়ই ঘটেছে তাদের জীবনে অন্ততঃ পক্ষে যাঁদের জীবনের আদর্শ প্রাত:স্মরণীয়। উল্লেখ্য মহামানব বুদ্ধ,কবি রবীন্দ্রনাথ,বিদ্রোহী কবি নজরুল,শীল তেজদপ্ত সংঘরাজ শীলালংকার।ভাষান্তরে বিধৃত হয়,বিয়োগ বেদনাহত হৃদয় উৎসারিত প্রেম স্বজনে সীমাবদ্ধ থাকে না,তা বহুজনের সুখে বহুজনের হিতে উৎসারিত।
বৃটিশ সরকারের কনোষ্টেবল বাবা কর্মক্ষেত্রে ন্যায় নিষ্ঠা ও কর্তব্যপরায়নতার জন্য ‘সাধু’ হিসেবে অভিহিত হলেও শৈশবের ক্রান্তিলগ্নে লোকনাথের সুন্দর জীবন গড়ার প্রয়াসে সযত্ন শাসনে ছিলেন তিনি কঠোর।মাতা মেনকাও সন্তানের উন্নতি কামনায় স্বামীর পার্শ্বে ছিলেন একান্ত সহযোগী হিসেবে।পাড়া প্রতিবেশী,অন্য দশজন সাধারণ স্ত্রী লোকের তুলনায় মেনকা দেবী সংসার ধর্ম পালনে ছিলেন ব্যতিক্রম ধর্মী।ধর্মে কর্মে ছিল তাঁর প্রগাঢ় অনুরাগ।মাতা পিতার সুকঠোর পারিবারিক বাঁধনে বাল্যের কোঠায় পদার্পনের আগেই মাতা মেনকা কালের অমোঘ বিধান মেনে নিয়ে ধরাধাম থেকে বিদায় নিলেন চিরকালের তরে।বাবা প্রেমলাল তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়।জীবনের এক সন্ধিক্ষণে লোকনাথ কান্ডারী বিহীন তরণী সদৃশ সময়ের পরম মুহূর্তগুলোকে একে একে যখন হারানোর বেদনাকে আনন্দের আতিশয্যে অতিবাহিত করে বিনোদনে ব্যাপৃত হয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন ঠিক সেইক্ষণে নবজাত ছোট্ট বোনের দেখাশোনার ভার নিতে হলো তাকে ঠাকুরমার সাথে।উলট পালট হয়ে গেল সব।ছেদ পড়লো পড়াশোনায়।গ্রামবাসীর মুষ্টিচাল নির্ভর পাঠশালার ছাত্র লোকনাথের প্রথম শ্রেণীর পাঠ শেষ হলো না।ইতিমধ্যে পাঠশালার একমাত্র শিক্ষক লোকনাথের পিতৃব্যমহ মাষ্টার বীরমোহন বড়–য়া পাঠশালার শিক্ষকতা ত্যাগ করেন।পাঠশালার অংগনেও তিনি হারালেন এক পরম হিতৈষীকে।এ যেন দু:সময়ের অন্তরালে দুর্যোগের অবস্থান,সুযোগের অবকাশে উদ্ধত ফনার ছোবল।একে অন্যরা নিয়তি বললেও আমরা বলি কর্মের বিপাক।
---ঃঃবাল্যকাল ও শিক্ষাজীবনঃঃ--- -
বাল্যের স্বভাব সুলভ চপলতা যখন মাতৃহারা লোকনাথের হৃদয় কন্দরে বেদনার ছাপ হয়ে জীবনের স্বাভাবিক গতিকে নিয়ন্ত্রিত করছিল,চাকুরে বাবার অনুপস্থিতিতে গৃহ ছিল যখন নি:সঙ্গ নবজাতকের আর্তকান্নায় আহাজারীতে পূর্ণ তখন ঘরে নিয়ে এলেন প্রেমলাল তার দ্বিতীয় স্ত্রী লোকনাথের বিমাতা ¯েœহলতা বড়–য়া।বিমাতার আগমনে বালক লোকনাথ বোনের দেখাশোনার কাজ থেকে অব্যাহতি পেলেও বাবা প্রেমলাল দীর্ঘ দুই বছর সময়ের ব্যবধানে আবার সেই পাঠশালায় তাকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করে দিলেন।পাঠশালার শিক্ষকতা কাজে নিয়োজিত হয়ে আসলেন আঁধারমানিক গ্রামের পন্ডিত ধর্মরাজ বড়–য়া।শিষ্যের তুলনায় একলব্য আরুনী অদ্যাবধি যেমন অনুপম,গুরু আর পাঠশালার তুলনায়ও সেদিনের শিক্ষাব্যবস্থা আজও অ¤øান।ক্ষয়ে যাওয়া সেই দিনের শিক্ষাব্যবস্থার অকৃত্রিমতা,শিষ্যের গুরুর পরিচর্যা,গুরুর দেহমন দিয়ে শিষ্যের কল্যাণ সাধন সে কী আর পাঠশালার আদর্শ ছিল!অবশেষে পন্ডিত ধর্মরাজ বড়–য়াও পাঠশালা ছাড়লেন এবং তার স্থলাভিষিক্ত হলেন বিনাজুরী নিবাসী মাষ্টার রজনী বড়–য়া।তার হাতে বালক লোকনাথ চতুর্থ শ্রেণীর পাঠ শেষ করেন।কিন্তু গ্রামের পাঠশালায় ইংরেজি পড়া হয়নি বলে পরবর্তীতে বিনাজুরী নবীন এম,ই, স্কুলে পুন: তাঁকে ভর্তি হতে হলো তৃতীয় শ্রেণীতে।সেখানে তিনি চতুর্থ শ্রেণীতে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়ণ সমাপ্ত না করেই তিনি তিনি বাধ্য হলেন বিনাজুরী নবীন উচ্চ বিদ্যালয় ত্যাগ করতে।কারণ তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের(১৯৩৯-১৯৪৫) রণ দামামা শিথিল হয়ে বাজছিলো।যুদ্ধ পরবর্তী ভয়াবহ মহামারী আর দুর্ভিক্ষ সারা বিশ্বের ঘরে ঘরে অজ¯্র মৃত্যু আর আর্তনাদের হাহাকার তুলেছিল, তার থেকে লোকনাথের পিতা প্রেমলাল ও অব্যাহতি পেলেন না।কনোস্টেবেল প্রেমলাল তখন হাবিলদার প্রেমলাল হলেও রোজগারের টাকা দিয়ে তার পক্ষে সংসার চালানো কষ্টকর ছিলো।ওঁতপেতে থাকা দু:সময় আবারও এক ছোবল মারলো,কেড়ে নিলো ঠাকুরমা(নবকুমারী বড়–য়া)কে।হাবিলদার প্রেমলাল কর্তব্য নিষ্ঠার পরাকাষ্ঠায় তিলে তিলে নিজেকে সঁপে দিলেন কঠিন পীড়ার নিষ্ঠুর ছোবলে।হাঁপিয়ে উঠলেন তিনি।বিশ্বযুদ্ধের করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পেলেও তিনি জীবনযুদ্ধে নিরন্তর হেরে যাচ্ছিলেন।অগ্রিম পেনশন নিয়ে অবসর গ্রহণ করে তিনি কৌশল বদলালেন বটে কিন্তু বালক লোকনাথের পড়ালেখা বন্ধ করে দিয়ে তাঁকে দোকানদারীর কাজে নিয়োজিত করলেন।সংসার চললো ঠিক কিন্তু পিতা প্রেমলাল অন্তরে স্বস্তি পাচ্ছিলেন না একমাত্র ছেলের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে।তাঁকে ভীষণ দু:চিন্তায় পড়তে হলো।তখন বালক লোকনাথের সময়ের ঘন্টায় বেজে উঠলো কৈশোরের সংকেত ধ্বনি।
---ঃপ্রব্রজ্যা ও প্রব্রজিত জীবন এবং মাধ্যমিক পাঠঃ---
বিনাজুরী নবীন এম,ই স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র বালক লোকনাথ বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ কালে তাঁর ঠাকুরমার মৃত্যু হয়।ঠাকুরমার সাপ্তাহিক ক্রিয়া উপলক্ষে বালক লোকনাথ প্রথানুসারে সর্বপ্রথম প্রব্রজিত হন।কিন্তু পারিপার্শ্বিকতা শ্রমনের স্কুল গমনের উপযোগী ছিলনা বলে সপ্তাহের মধ্যেই তিনি প্রব্রজিত শ্রামন্য জীবন ত্যাগ করলেন।সময়ের ব্যবধানে কৈশোরের কোঠায় পদার্পন করতে করতে লোকনাথের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেলেও পড়ালেখায় তাঁর আগ্রহের আগ্রহের তীব্রতা বিনাজুীর শ্মশান বিহারের শ্রামন সারানন্দকে আকৃষ্ট করলো।শ্রামণ সারানন্দ ছিলেন লোকনাথের মাতুল।শ্রামন সারানন্দের গৃহী নাম নগেন্দ্রলাল বড়–য়া।তাঁর বাড়ী পশ্চিম বিনাজুরী।ব্যবসা করতেন আকিয়াবে।মনে ভাবান্তর উদয় হওয়ার পর তিনি আকিয়াব থেকে দেশে ফিরে আসেন এবং গহিরা অবস্থানকালে ষষ্ঠ সংঘরাজ ধর্মানন্দ মহাস্থবিরের নিকট প্রব্রজিত হন।প্রব্রজিত হওয়ার পর বিনাজুরী শ্মশান বিহারের অধ্যক্ষ ভিক্ষু বসুমিত্রের সাহচর্যে অবস্থান করতে থাকেন।তিনি লোকনাথের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে দেখে ভগ্নিপতি প্রেমলালকে তাঁর পড়ালেখার ভার গ্রহণ করার প্রস্তাব দিলে প্রেমলাল বাবু অতি সানন্দে সেই প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেন।লোকনাথ বড় মাতুলের আশ্রয়ে চলে গেলেন।শ্রামন সারানন্দ ভাগ্নে লোকনাথকে শ্মশান বিহারের নিকটবর্তী সোনাইরমুখ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি করে দিলেন এবং লোকনাথ মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।তিনি সোনাইর মুখ প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে পঞ্চম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।গোঁড়া থেকেই বালক লোকনাথ পড়ালেখায় আগ্রহী ছিলেন এবং গণিতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন যার কারণে সে সহপাঠীদের নিকট অতীব প্রিয় ছিলেন।ক্রমে বাল্যের চপলতা কাটতে শুরু করলে তাঁর দৈনন্দিন আচরণে গুরুগম্ভীর রূপ পরিস্ফুটিত হতে থাকে। এই সময়ে ধর্ম চর্চা ও জ্ঞান সাধনার জন্য তাঁর মনে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি হতে শুরু করলো।সাধারণ শিক্ষার সাথে সাথে তিনি শুরু করলেন ধর্ম বিনয় শিক্ষা এবং তারই প্রভাবে ক্রমান্বয়ে সাধারণ শিক্ষার মোহ কাটিয়ে তাঁর ঝোক প্রবল হতে থাকে ধর্ম বিনয শিক্ষার প্রতি।এবার তাঁর মনে একজন উপযুক্ত শিক্ষাগুরুর সন্ধান লাভে ব্যাকুল হলে তিনি তাঁর আগ্রহের কথা মাতুল সারানন্দকে জানালেন।মাতুল ভাগ্নের মধ্যে বৈরাগ্যেও উৎপত্তি হওয়ার লক্ষণ সমুহ বিচার করে দেখলেন এবং এই সময়ে তাঁর একজন উপযুক্ত গুরুর প্রয়োজন উপলব্ধি করলেন।তখন হাটহাজারী উপজেলর জোবরা গ্রামে সুগত বিহাওে অবস্থান করছিলেন সমাজসংস্কারক উপসংঘরাজ শ্রীমৎ গুণালংকার মহাস্থবির।তাঁরই সান্নিধ্যে এনে মাতুল সারানন্দ ভিক্ষু সমর্পণ করলেন আপন ভাগ্নে কিশোর লোকনাথকে ধর্ম শিক্ষা লাভ করার মানসে।মহান চরিত্রের বিকাশ লাভে দেখা যায় সমগোত্রীয় কারো না কারো দাক্ষিণ্যের প্রয়োজন।বড়ো বড়ো কবি সাহিত্যিকদের জীবনে প্রভাব পড়তে দেখা গেছে দেশি বিদেশী অনেক বড়ো বড়ো কবি সাহিত্যিকের,বিজ্ঞানীর কাছে প্রভাব পড়েছে বিজ্ঞানীর,পুত্রের কাছে পিতার।তেমনি করে মাতুল সারানন্দের প্রভাব পড়েছে লোকনাথের জীবনে।পূজ্যস্পদ ভদন্ত জ্ঞানশ্রী কান্ডারী বিহীন তরী সদৃশ জীবনের হালধরা আর পাল তোলার কোনরুপ নির্দেশ যখন পাচ্ছিলেন না তখন সেই নির্দেশ নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন মাতুল সারানন্দ।কান্ডারী সারানন্দ শ্রামণ তাই আমাদের বন্দনার যোগ্য পাত্র।শাসন হিতে তাঁর অবদান ভদন্ত জ্ঞানশ্রী।
তখন ছিলো ইংরেজি সনের ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দ।জোবরা সুগত বিহারে অবস্থানকালে কিশোর লোকনাথের মানসিকতার পরিবর্তন গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন আচার্য গুণালংকার এবং উপযুক্ত সময় বিবেচনা করে আয়োজন করলেন লোকনাথের প্রব্রজ্যা দানের এবং লোকনাথ প্রব্রজ্যিত হলেন সে সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসন ধ্বজ গুরু আচার্য গুণালংকার মহাস্থবিরের উপাধ্যায়াত্বে। লোকনাথ নবজীবন লাভ করে সম্বুদ্ধ শাসনে প্রবেশ করলেন এবং তাঁর গুরুদেব নাম রাখলেন ‘‘জ্ঞানশ্রী’’ শ্রামণ যার অর্থ নিজের জ্ঞান শ্রীমন্ডিত বা চমৎকার জ্ঞানের সৌকর্য।আচার্য উপসংঘরাজ গুনালংকার মহাস্থবিরের গৌরবময় কর্মপরিসর যেই প্রতিভাগুণে একসময় ভীষণভাবে আলোচিত ছিলো যিনি উখিয়ার পাতাবাড়ি থেকে সুদূর কুমিল্লা তথা বরিশালের খেপূপাড়া পর্যন্ত নিজের কর্মের আধিপত্য বিস্তার করে বৌদ্ধ ধর্ম শাসন বিষয়ক নানারুপ জটিলতর সমস্যার মীমাংসায় পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছিলেন।সেই প্রাত:স্মরণীয় আচার্য গুণালংকার মহাস্থবিরের সান্নিধ্যে থেকে শ্রামণ জ্ঞানশ্রীর শ্রামণ্য জীবনের শিক্ষালাভ শুরু হয়।আচার্য গুণালংকার মহাস্থবিরের প্রত্যক্ষ প্রভাব তাঁর জীবনে পরিলক্ষিত হয় সমাজ ও শাসনের বহু সংস্কার করার প্রয়াসের মানসিকতা তাঁর মধ্যে অংকুারত হওয়াতে।এরই মধ্যে শ্রামণ জ্ঞানশ্রীর আচার্য শিক্ষায় বিঘœ ঘটেছে।আচার্য গুণালংকার বিশেষ করে পর্যটক ভিক্ষু ছিলেন।সেই কারণে বিহারে অবস্থান তাঁর খুব স্বল্প সময়ের জন্য হতো।তাঁর অনুপস্থিতিতে ধর্ম বিনয় শিক্ষায় শ্রামণ জ্ঞানশ্রীর পিপাসা মিটতো না।তাঁর ব্যগ্রতা জানালেন তিনি মাতুল সারানন্দ ভিক্ষুকেকে।তিনি মনস্থির করলেন ভাগ্নেকে গুমানমর্দন বিহারে অবস্থানরত ভদন্ত শান্তরক্ষিত স্থবিরের সান্নিধ্যে রেখে ধর্ম বিনয় শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে তুলতে।াঅচার্য গুণালংকারের নিকট উত্থাপন করলে তিনি তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন।শ্রামণ জ্ঞানশ্রী ভদন্ত শান্তরক্ষিত স্থবিরের সান্নিধ্যে অন্তেবাসী শিক্ষার্থী হিসেবে গুমানমর্দন বিহারে অবস্থান করে ধর্ম বিনয় শিক্ষার মনস্থির করলেন বটে কিন্তু সে সুযোগ পান নি।কারণ সেই সময়ে মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে বর্ষাবাস যাপনের জন্য নির্বাচিত ভিক্ষু যোগানন্দ তাঁর পূর্ব প্রতিশ্রæতি অনুযায়ী শান্তিধাম বিহারে আসতে না পারায় আচায গুণালংকার মহাস্থবির মহোদয়ের কাছ থেকে প্রার্থনা করে মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারের দায়কবৃন্দ শামণ জ্ঞানশ্রীকে বর্ষাবাস যাপনর জন্য তাদের বিহারে নিয়ে যায়।সেইথেকে যে শ্রামণ জ্ঞানশ্রীর উপর বিহার পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হলো তাতে তাঁর সমাজ ও শাসন সংস্কারমূলক কাজের সূচনা ও ভিক্ষু জীবনে তা মহীরূপে বিশাল ছায়া বিস্তার করে তাঁর মহৎ জীবনের সূত্রপাঠ ঘটিয়েছে।
মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে অবস্থানকালে শ্রামণ জ্ঞানশ্রীর শিক্ষা ও কর্মজীবনের সমন্বয় ঘটতে থাকে।একাধারে তিনি ধর্মীয় শিক্ষালাভ ,সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে ম্যাট্রিকুলেশন প্রস্তুতি,বিহার উন্নয়ন এবং দায়কদের মধ্যে ধর্মের প্রভাব বিস্তারের ব্রত গ্রহণ করলেও পার্থিব বিষয়ের প্রতি তাঁর অনীহা দিন দিন প্রবল হতে থাকে যে তাঁর কাছে ধর্ম বিনয় শিক্ষা ব্যতীত অন্য বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেত না।ফলে কার্যত সাধারণ শিক্ষার পরিসর সমাপ্ত করার মানসে ১৯৫৩ ইংরেজি সনে মির্জাপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও সাফল্যমন্ডিত হতে পারেন নি।দ্বিতীয়বার সে দিকে মনোযোগ দেয়ার আগ্রহ তাঁর মধ্যে একেবারেই অনুপস্থিত ছিলো।সাধারণ শিক্ষার গুরুভা মাথা থেকে নামিয়ে তিনি মনোযোগ দিলেন বিহার সংস্কারে।শান্তিধাম বিহারের দায়ক যারা ছিলেন বিশেষ করে দু‘এক পরিবার ছাড়া আর কারও আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিলো না।আত্মবিশ্বাস এবং আত্মশক্তিতে নির্ভর শ্রামণ জ্ঞানশ্রী পরিলক্ষিত কর্মসূচী নিয়ে সারাজীবন যে ভাবে স্বনির্ভরতার আহবান জানিয়েছেন সমাজের কল্যাণে নিয়োজিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের তাঁর ইংগিত মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারের সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য গৃহীত কর্মসূচী থেকে আমরা সুস্পষ্ট ভাবে দেখতে পাই।তিনি বিহার উন্নয়নের জন্য বিহারের দায়কদের কাছ থেকে মুষ্ঠি চাউল চাঁদা নির্ধারণ করলেন এবং পরিকল্পিত পথে ধীওে হলেও বিহারোপযোগী রূপদান করতে সক্ষম হয়েছিলেন।তাঁরই পরিকল্পনার পরিসরে পরবর্তীকালে মহামান্য সংঘরাজ শীলালংকার মহাস্থবির মহোদয়ের পূণ্যতেজে থাই প্রচেষ্টায় শান্তিধাম বিহার দর্শনীয় রূপ পরিগ্রহ করেছে।তাঁর পেছনে শ্রামণ জ্ঞানশ্রীর মেধা ইতিহাসের উপাদান হয়ে রয়েছে।
---ঃউপসম্পদা ও শ্রামন্য জীবনের অবসানঃ---
প্রব্রজ্যিত হওয়ার পর শ্রামণ জ্ঞানশ্রী আচার্য গুণালংকার মহাস্থবিরের সান্নিধ্যে জোবরা সুগত বিহারে অববস্থান করতে থাকেন এবং পরবর্তীতে বর্ষাবাস যাপন শুরু করেন মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে। এই সময়ে মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে অবস্থান করলেও গুরুদেবের প্রত্যক্ষ তত্ত¡াবধানে তিনি ধর্ম বিনয় ও পৌরহিত্যের কাজ সমাধা করতেন।১৯৪৯ খৃঃ শ্রামন জ্ঞানশ্রীর জীবনের এক পয়মন্ত সময়। এ সময় গুরু উপসংঘরাজ গুনালংকার মহাস্থবির শ্রামণ জ্ঞানশ্রীর ধর্মানুরাগ,প্রিয়শীল ধর্মীয় জীবনযাপনের নানা দিক অবলোকন করতঃ তাকে উপসম্পদায় অভিষিক্ত করার বিষয় বিবেচনা করেন।আচার্য গুনালংকার তাঁর প্রিয় শিষ্যকে ঐতিহাসিক বিহার সীমায় উপসম্পদা প্রদান করার উদ্দেশ্যে সীমা নির্বাচন করলেন চাকমা রাজমহিয়ষী কালিন্দী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাজানগর শাক্যমুনি বিহার সীমা এবং সেখানে শ্রামণ জ্ঞানশ্রী ভিক্ষু জ্ঞানশ্রী অভিধা নিয়ে নবজীবন লাভ করলেন।আচার্য গুণালংকারের উপাধ্যায়াত্বে এ উপসম্পদা অনুষ্ঠানে সীমা আচার্য ছিলেন --৬ষ্ঠ সংঘরাজ ধর্মকথিক ধর্মানন্দ মহাস্থবির, কর্মবাচা আচার্য ছিলেন রাজানগর শাক্যমুনি বিহারের অধ্যক্ষ রাজগুরু ভদন্ত ধর্মরত্ন মহাস্থবির।
সংগীতিকারক ছিলেন আচার্য ভদন্ত জ্ঞানীশ্বর মহাস্থবির,বিনয়াচার্য ভদন্ত বংশদ্বীপ মহাস্থবির,সত্যদর্শন প্রনেতা বিদর্শন গুরু বিশুদ্ধানন্দ মহাস্থবির,ভদন্ত ধর্মানন্দ মহাস্থবির (রাংগুনিয়া),ভদন্ত আনন্দমিত্র মহাস্থবির,ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির প্রমুখ।
উপসম্পদা লাভ করার শুভ মুহূর্তেও দুর্লভক্ষণ গুলির স্মৃতি রোমন্থন করার জন্য ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মাঝে মাঝে সেই অপূর্ব দর্শনীয় রাজানগর শাক্যমুনি রাজ বিহার দর্শন মানসে সেখানে গমন করতেন।ভিক্ষু অভিধা লাভ করে তিনি প্রত্যাবর্তন করলেন মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে।তখন থেকে তাঁর পরিপূর্ণ কর্মজীবন শুরু হয়।নিজে তিনি সম্পূর্নরূপে নিমগ্ন করলেন পালি সাহিত্য ও বৌদ্ধ ধর্মের সার চয়ন তথা জ্ঞান চর্চার বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশ করে।
---ঃসমতলের সোনালী অধ্যায়ঃ---
উপসম্পদা লাভ করে মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি সেখানে আরও পাঁচ বছর অতিবাহিত করেন।তিনি জ্ঞান চর্চায় এত বেশী মনোযোগী হয়ে পড়েছিলেন যে,ভিক্ষু জীবনের রক্তিম উষায় শুরু করলেন বিনয় আদ্যের পাঠ্যসূচীর অন্তর্গত জাতক সমূহের অনুবাদ।এ অনুবাদ কর্মের তাঁর সহায়ক ছিল পন্ডিত ঈষান চন্দ্র ঘোষের বাংলা জাতক।তখন তাঁর বয়স পঁচিশের কোঠা পেরিয়ে যৌবনের উদ্দামতায় উচ্ছসিত সমুদ্র তরঙ্গের ন্যায় কামনার কূলে কূলে আছড়ে পড়ছিলো।সাধকের সংযম তখন সাধনার জ্ঞান সাধনার পরাকাষ্ঠায় কামনার সাগর মথিত করে তুলে আনছিলো বৈরাগ্যের অমৃত স্বাদ।শ্রামণ ও ভিক্ষু জীবনের দশকের কোটা পার না হতেই মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারের তদানীন্তন পরিবেশ তাঁর জ্ঞান সাধনার জন্য অত্যন্ত অপরিসর হয়ে উঠলো।তিনি বৃহত্তর জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র খুঁজতে লাগলেন।
বুদ্ধ বলেছেন "চরথ ভিকখবে চারিকং,বহুজন হিতায় বহুজন সুখায "
হে ভিক্ষুগন ধর্মের সুধা নিয়ে দিকে দিকে বিচরণ কর,আত্মহিত ও পরহিতার্থে ধর্মসুধা বিতরণ কর"
তাই এই মূলমন্ত্র ধারণ করে নব উপসম্পদা প্রাপ্ত ভিক্ষু জ্ঞানশ্রী ধর্মপ্রচারের ব্রত নিয়ে ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ৬ বছর মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে অবস্থানের পর ১৯৫৫ সালে মির্জাপুর ত্যাগ করে চলে আসেন রাউজান বিমলানন্দ বিহারে।সেখানে অবস্থানকালীন তিনি প্রতি মঙ্গলবার ধর্মসুধা দান,ধর্মজ্ঞান সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বিশেষ ভুমিকা পালন করে সবার সাধুবাদ অর্জন করেন।ধর্মদানের এই উত্তম পন্থায় তিনি এখানে জ্ঞানী গুনীদের সংস্পর্শে গঠন করেন 'জাতক পরিষদ' নামে এক ধার্মিক মন্ডলী।জাতক পরিষদের কর্মকান্ডে সক্রিয়ভাবে যাঁরা ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীকে সহায়তা দান করেছিলেন তাদের মধ্যে রাউজান আর্য্যমৈত্রেয় উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত উপেন্দ্রলাল বড়–য়া,অধ্যাপক ললিত কুমার বড়ুয়া,লালেন্দ্রলাল বড়–য়া,দানবীর বীতশোক মহাজন ও বর্তমান খ্যাতিমান বিদর্শনাচার্য্য শ্রামণ বোধিপাল প্রমুখ সমসাময়িক আরও অনেকে।তৎকালীন সাপ্তাহিক ছুটির অবকাশে নিয়মিত জ্ঞান চর্চা তাঁর জীবনে অংকুরিত হয়েছিল অতৃপ্ত অন্বেষা।জ্ঞান সমুদ্রের তীরে উত্তাল খন্ড খুঁজতে গিয়ে তিনি সংস্কারক মনটিকে মেরে ফেলতে পারেন নি।রাউজান শান্তিধাম বিহারেরর (মুলাইংয়ের ক্যাং) পরিচালনার দায়িত্বও নিয়ে তিনি দুটি বিহারের সংস্কার ও উন্নয়নে ততপর ছিলেন।মুষ্টি চাউল নিয়মিত আহরিত হলো,গড়ে উঠলো বিহার উন্নয়ন তহবিল।সে তহবিল নিয়ে প্রভূত উন্নতি সাধন করলেন বিহারগুলোর।রাউজান বিমলানন্দ বিহাে অবস্থানকালীন যেই কয়জন বিদগ্ধজনের সান্নিধ্য তিি লাভ করেছিলেন পরবর্তী জীবনে ভদন্ত জ্ঞানশ্রী তাদের প্রতি গভীর সন্তোস প্রকাশ করতে দেখা গেছে।তাদের গুণগ্রাহীতার বিবরণ এই পরিসরে লিপিবদ্ধ করা সম্ভব না হলেওতা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য জ্ঞাতব্য হয়ে থাকবে।প্রকৃতপক্ষে ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীর সৌরভ মন্ডিত গুণাবলীর বিকাশ বিমলানন্দ বিহারে অবস্থান কালে শুরু হয়।সোনালী ঊষার ইংগিতবহ পূর্ব দিগন্তে তপন বলয় যেমন মধ্যাহ্নের তাপ বিকিরণ করার ইংগিতবহ তেমনি রাউজান বিমলান্দ বিহারের ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীর জ্ঞান অন্বেষা আভাষিত করেছিল তাঁর ভবিষ্যত জীবনের দেদীপ্যমান গৌরবোজ্জ্বল কর্মকান্ড গুলোর।বিশ্লেষনমূলক অনুমান করা মোটেই অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে,রাউজান বিমলানন্দ বিহারে অবস্থানকালে ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীর জীবন ধারার দুটি খাতের মধ্যে যেটি প্রবল ছিল তা পান্ডিত্যের। কিন্তু ভিক্ষু সংঘের নির্দেশে সমতল ত্যাগ করে তিনি যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম গমন করেন তাঁর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ধ্যান ধারণা প্রবল হয়ে উঠে।আজকের বিকশিত জ্ঞানশ্রী অনেক বড়ো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তিত্ব পন্ডিত জ্ঞানশ্রীর কর্মপরিসরে।রাউজান বিমলানন্দ বিমলানন্দ বিহারে ভিক্ষু জীবনের (১৯৫৫-১৯৫৭) দুই বছর অবস্থান করে ১৯৫৭ ইংরেজি সনে তিনি যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের মহালছড়ি উপজেলার মুবাইছড়ি গমন করেন তখন তাঁর শ্রামন্য ও ভিক্ষু জীবনের এক যুগ তিন পর্বে সমাপ্ত হয়।
---ঃপাহাড়ী চট্টলায় ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীঃ---
১৯৫৭ ইংরেজি সাল।রাউজান বিমলানন্দ বিহারের জ্ঞানী গুণী জনের সংস্পর্শ ত্যাগ করে ভিক্ষু জ্ঞানশ্রী মহান ভিক্ষু সংঘের নির্দেশে এক অনাথ পিতা ও শিক্ষার আলোর দিশারী হয়ে পাড়ি জমান দুর্গম পার্বত্য জেলার মহালছড়ি উপজেলার মুবাইছড়িতে।তাঁর প্রতি ভিক্ষু সংঘের এ নির্দেশ দানের কারণ হলো,রাউজান বিমলানন্দ বিহার ও মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে অবস্থানকালে ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীর সংস্কারধর্মী চরিত্রের বিকাশ ঘটে এবং তারই আলোকে ভিক্ষুসংঘ পার্বত্য চট্টলার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় সচেতনতা জাগ্রত করাসহ বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার প্রসার উদ্দেশ্যে একমাত্র ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীকে নিযুক্ত করা ছাড়া দ্বিতীয় কোন যোগ্য ভিক্ষু খুঁজে বের করতে সমর্থ হন নি।সমসাময়িক কালে খৃষ্টান মিশনারীরা পার্বত্য চট্টলার পেছনে পড়া উপজাতীয়দের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টায় লিপ্ত থেকে বৌদ্ধ ধর্মের উপর প্রচন্ড আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিল।ধর্মান্তরিত করার এই প্রয়াসকে প্রতিরোধ করার জন্য বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার প্রসার কল্পে যে যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল তা একমাত্র ভিক্ষু জ্ঞানশ্রী ব্যতীত আর কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না।ফলে তিনি সমতলের জ্ঞান সাধনা আর সংস্কার কর্মসূচিকে পেছনে ফেলে পাহাড়ী চট্টলার বৌদ্ধ ধর্মকে অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচাতে নির্ধিধায় ভিক্ষুসংঘের নির্দেশ শিরোধার্য করে সমতল ত্যাগ করে মুবাইছড়ি অবস্থানের জন্য চলে গেলেন।ধর্ম ও শাসনকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার জন্য যে সকল বিদগ্ধজন অধীর আগ্রহে একজন সংস্কারকের আগমন প্রত্যাশায় দিন গুণছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন মুবাইছড়ির চেয়ারম্যান বাবু বিন্দুকুমার খীসা আর পুরঞ্জয় মহাজন। নিরক্ষর, দরিদ্র, অসহায় পার্বত্য সন্তানদের মানুষ করার ক্ষেত্রে তারা ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলেন।তৃষিত ধরনীর বুকে নিদাঘের প্রচন্ড দাহনের পর বারিবর্ষনে উৎফুল্লিত চাতকের আনন্দে মুবাইছড়ির বৌদ্ধ জনগণ ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীকে স্বাগত জানালেন।তাঁর পাদপদ্মে সমর্পন করলেন তাদের ধর্মীয় চেতনাবোধ আর সংস্কারের দায়-দায়িত্ব।ভিক্ষু জ্ঞানশ্রী তাঁর পরিকল্পিত কর্মসূচী শিরো ভাগে স্থান নির্ধারণ করলেন শিক্ষার।প্রথমে শিক্ষা পরে চেতনাবোধ ও সংস্কার মানুষের মনে প্রত্যয় জন্মাতে সক্ষম হন।ধর্মকে ব্যক্তির মধ্যে দৃঢ় মূলবদ্ধ করতে হলে যেভাবে এগোনোর প্রয়োজন।ভিক্ষু জ্ঞানশ্রী নির্ভুলভাবে তার অনুশীলনে ব্যাপৃত হলেন।পাঠশালা শুরু হলো,সন্তান সন্ততিদের আগমনের সাথে পিতা মাতার সংস্কার উদ্বুদ্ধ হলো।এগিয়ে আসল ধীরে ধীরে মুবাইছড়ির ধর্মপিপাসু জনগণ যাদের সহায়তায় গড়ে তুললেন 'জ্ঞানোদয় পালি টোল'।ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীর জ্ঞানোদয় পালি টোল জ্ঞানের উন্মেষ ঘটালো পেছনে পড়া পাহাড়ী উপজাতীয় বৌদ্ধদের সাড়া জাগালো এলাকায়।ঊষার তরুন তপনের বিকশিত আলোর ছটার মতো ছড়িয়ে পড়লো মুবাইছড়ির কর্মকান্ড সমগ্র পাহাড়ী চট্টলায়।প্রভাবিত হলো বুদ্ধ জনগণ।আশার সঞ্চার হলো তাদের,মুক্তির ইশারায় তারা আবার জেগে উঠলো,প্রতিরোধ হলো ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া।ভিক্ষু জ্ঞানশ্রী তিন বছর মুবাইছড়িতে অবস্থান করেন।এই সময় সমতলী ও পাহাড়ী আবহাওয়ায় তাঁর স্বাস্থ্যের উপর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেল।তিনি প্রায়দিনই অসুস্থতা বোধ করতেন।বিশেষ করে পেটের কামড়ী তাঁর অসুস্থ হওয়ার অন্যতম লক্ষন ছিল।প্রত্যয়ে দৃঢ় মানসিকতার অধিকারী ভিক্ষু জ্ঞানশ্রী স্বাস্থ্যহানির মতো প্রতিকূল অবস্থাকে মোকাবলা করে মুবাইছড়িতে তাঁর সংস্কার কার্য পরিচালনা করেছিলেন।পতনোন্মুখ শাসন ধ্বজাকে অতি সতর্কতার সাথে উড্ডীন রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন।তিনি পালি টোল প্রতিষ্টার পর ধর্মীয় শিক্ষায় পারদর্শী শিক্ষার্থীদের মাঝে মেধার স্বীকৃতি স্বরূপ প্রদান করতেন মেধা সীল।তাঁর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় তখনকার সময়ে পার্বত্য অঞ্চলের পথঘাট এতই দুর্গম ছিল যে না ছিল ভাল পথঘাট না ছিল যানবাহন।শুধু খাগড়াছড়ি পৌছতেই লেগে যেত সপ্তাহকাল!!ভান্তে সেখানে যেতেন কখনো পায়ে হেটে কখনোবা নদীপথের লঞ্চে করে,নিয়ে নিতেন সাথে করে যতটুকু সম্ভব খাবার।
তখন ইংরেজি ১৯৬০ সাল। ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীর সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ মুবাইছড়ির জনগণের আর বেশীদিন হয়ে উঠলো না।কাপ্তাই জল বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মানের উদ্দেশ্যে যে বাঁধ দেয়া হলো তার ফলে সৃষ্ট বিপুল জলরাশিতে মুবাইছড়ি জলমগ্ন হওয়ায় সেখানকার উপজাতি অধিবাসীরা তাদের পূর্ব পুরুষের ভিটার মাটি ত্যাগ করে ছড়িয়ে পড়লো নানা স্থানে বসতি স্থাপন করে। সেই জলমগ্নতার ভয়াবহতায় ভিক্ষু জ্ঞানশ্রী ও ৩ বছর সেখানে অবস্থানের মুবাইছড়ি ত্যাগ করলেন।তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর আরম্ভ করা কাজ এখনো সমাপÍ হয়নি।উপজাতীয়দের মাঝে তাঁর অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন শাসনহিতে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয়ে।তাই খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা বোয়ালখালী উপজেলার দশবল চাকমা রাজবিহারে তিনি অবস্থান শুরু করেন।আত্মপ্রত্যয় আর কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে ভিক্ষু জ্ঞানশ্রী সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন ধর্মোদয় পালি টোল এবং দু:স্থ উপজাতীয় শিশুদেল কল্যাণ কামনায় তাঁর ব্যগ্রতার ফসল হিসেবে বেড়িয়ে আসল পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম।তাঁর সঞ্চয় আর চল্লিশ হাজার বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকাবাসীর সাহায্যের প্রতিশ্রæতি নিয়ে তিনি এ অনাথ আশ্রমকে অতি সহসা স্বনির্ভর করে গড়ে তুললেন। আশ্রমের পোষ্যদের ভরণ পোষনের জন্য সংগ্রহ করে দিলেন প্রায় ১৫ একর ধান্য জমি।আশ্রমের সভাপতি ভদন্ত জ্ঞানশ্রী স্থবিরের প্রিয় শিষ্য মায়নী ভ্যালির উদাল বাগান গ্রামের বিমলতিষ্য ভিক্ষু এ আশ্রম থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে বর্তমানে শাসন সদ্ধর্মের ও আশ্রমের উন্নয়নমূলক কাজে নিয়োজিত আছেন।এ আশ্রমের অপর এক ছাত্র প্রিয়তিষ্য শ্রামন প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় কৃতিত্ব প্রদর্শন করে সরকারী বৃত্তি লাভ করেছে।বিশেষ উল্লেখনীয় যে,আশ্রমের যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ হয় সদ্ধর্ম হিতৈষী জনগণের স্বেচ্ছা প্রণোদিত দানের দ্বারাই।প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় জনগণের নিশ্চিত অংশগ্রহন পরিচালনার ত্রæটি বিচ্যুতি বিদূরিত করে এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্ম দেয়।পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম আমাদেও কাছে সেই শিক্ষা নিয়েই তখন উপস্থিত হয়েছিল।আর এ শিক্ষা ব্যবস্থার গোটাটাই ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীর একক কমিশনে প্রাপ্ত।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান।পার্বত্য চট্টল অনাথ আশ্রম আমাদের কাছে বিদ্যালয়ের আশ্রম,স্কুল,পালিটোল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে তিনি অবহেলিত পিছিয়ে পড়া আদিবাসী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় জ্ঞানপ্রভা বৃদ্ধি উত্তরণে ও সার্বিক জীবনযাপনে স্বাচ্ছন্দ্য আনয়নের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম থেকেই ভদন্ত জ্ঞানশ্রী একে একে অনেক মেধাবী সন্তন কে নিজের আদর্শে গড়ে তুলেছেন।এখান থেকে গড়ে উঠেছেন পার্বত্য তিন দিকপাল শিষ্য ভদন্ত বিমলতিষ্য মহাথের(বোধিচারিয়া প্রতিষ্ঠাতা,ভারত),ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের(ঢাকা বনফুল শিশু সদন ও আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজের পরিচালক),ভদন্ত শ্রদ্ধালংকার মহাথের(মোনঘর,রাঙামাটি পরিচালক) এবং এখান থেকেই পার্বত্য শিক্ষার মশাল তিনি প্রজ্জ্বলিত করে সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছেন।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী এখান থেকেই শিক্ষার মশাল প্রজ্জ্বলিত করে পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের হৃদয়ে চিরকালের জন্য আলোরদিশারী হয়ে রয়ে গেলেন।
তখন ১৯৭৩ ইংরেজি সাল।পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম সরকারী সাহায্য নিয়ে আত্মা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।তারপর স্বাভাবিকভাবে হায়েনার লোলুপ দৃষ্টি আপন ক্ষমতা করার জন্য ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীর পরিকল্পিত কল্যাণমুখী কাজকে অপপ্রচারের জৌলুসে চাপা দিয়ে যেই একটি অস্বস্থিকর পরিবেশের সূচনা করেছিল।তাই অবশেষে আপন হৃদয়ের সমগ্র বাসনার মূর্ত সেই প্রাণপ্রতিম প্রতিষ্ঠানকে শিষ্যদের হাতে পরিচালনায় ছেড়ে দিয়ে বিশাল সমুদ্রের বিস্তার নিয়ে উদার জ্ঞানশ্রী দশবল রাজবিহার ত্যাগ এক অপরূপ মহিমার স্মারক।তখন ছিলো ১৯৭৭ ইংরেজি সনের ফেব্রæয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহ।তাঁর এ ত্যাগের মহিমা ভাবী কালের মানুষের অনুসরনীয় হলে যুগে যুগে প্রাতিষ্ঠানিক কেলেংকারীর অবসান হবে এবং মানব সমাজের কল্যাণময় সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত হবে।কথিত আছে তৎকালীন সময়ে পার্বত্য চট্টল অনাথ আশ্রমে প্রায় প্রতিনিয়ত ৬০০ জনের অধিক ছাত্র ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষায় নিয়োজিত থাকতেন।বর্তমানে পার্বত্য চট্টল আশ্রমে দায়িত্বে আছেন ভদন্ত প্রজ্ঞাজ্যোতি মহাথের। তিনি বর্তমানে সরকারি ক্যাপিটেসন গ্র্যান্ট নিয়ে প্রায় ১০০ জন ছাত্র নিয়ে এই আশ্রম এখনো ধরে রেখেছেন।
ভদন্ত জ্ঞানশ্রী বোয়ালখালীর মায়ানী দশবল রাজ বিহারে প্রায় সতের বছর অবস্থান করেন।দায়কদের সদ্ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য তাঁর দরদী মন যে কোন রূপ কষ্ট স্বীকার করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল।তিনি একজন মাত্র দায়কের শ্রদ্ধার পুনরুজ্জীবন ঘটাবার লক্ষ্যে বোয়ালখালীর তেবাংছড়া বিহারে এক বর্ষাবাস যাপন করেন।তিনি যখন জানতে পেরেছিলেন যে,তেবাংছড়া বিহারের প্রতিষ্ঠাতা ধনার বাপ সদ্ধর্মের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা স্থির রাখতে পারছিলেন না,তখন তাঁর চিত্তকে সদ্ধর্মের অনুসারী করার মানসে তেবাংছড়া বিহারে যাপন করার মনস্থির করেছিলেন।
---ঃবনশ্রমনের উপসম্পদা প্রদানের উদ্যোক্তা ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীঃ---
বর্তমান সময়ের ভিক্ষুকূল গৌরব পূজনীয় সাধনানন্দ মহাথের'র(বনভান্তে) ভিক্ষু জীবনের প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য সময় জুড়ে রয়েছেন ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের।ভদন্ত জ্ঞানশ্রীর শ্রীমুখ থেকে স্মৃতিচারণ মতে,তৎকালীন সময়ে বনশ্রমন নাকি উপসম্পদা নিতে অনাগ্রহী ছিলেন।ভান্তে নাকি নিজে উৎসাহ দিয়ে একপ্রকার জোড় করে উপসম্পদা দিয়েছিলেন বনশ্রমনকে যিনি উপসম্পদা নিয়ে বর্তমানে বনভান্তে নামে অধিক পরিচিতি লাভ করেছে।তখন ১৯৬১ ইংরেজী সাল।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের বনশ্রমনকে উপসম্পদা দেওয়ার মানসে তার ধর্মগুরু উপসংঘরাজ গুনালংকার ভান্তেসহ জিনবংশ মহাথের,রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের,মায়ানীর অরিন্দম মহাথের,প্রিয়দর্শী,ধর্মদর্শী প্রমুখ ভিক্ষু সংঘকে দুর্গম দীঘিনালার বোয়ালখালি তে নিয়ে যান।তখনকার সময়ে যোগাযোগ ব্যবসথা এত প্রতিকূল ছিল যে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐ অঞ্চলে পৌঁছাতে পদব্রজে কয়েকদিন সময় লেগেছিল তাঁদের।বনশ্রমনের একজন পরম কল্যাণকামী উদ্যেক্তা হয়ে তিনি ভিক্ষুসংঘকে নিয়ে নিজে সংগীতিকারক হয়ে গুরুদেব গুনালংকার মহাথেরর উপাধ্যায়ত্বে মায়ানী নদীর উদক সীমায় বনশ্রমনকে শুভ উপসম্পদা প্রদান করেন।ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীর কল্যাণকারী সহযোগিতায় বনশ্রমন হয়ে গেলেন বনভিক্ষু(বনভান্তে)।
---ঃমোনঘরপ্রতিষ্ঠাঃ---
তখন ১৯৭৪ ইংরেজি সাল।মহামানবদের জীবন আলোচনায় দেখা যায় সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তাঁর নানারূপ বাঁধার সম্মুখীন হয়েছেন।এইভাবে যুগে যুগে যাঁরা মানব কল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন,মুখোমুখি হয়েছেন প্রতিপক্ষের।কিন্তু তাঁরা তা কাটিয়ে উঠে স্বীয় কীর্তির মহিমায় অ¤øান থেকেছেন,হয়েছেন প্রাত:স্মরণীয়।ভদন্ত জ্ঞানশ্রীর পার্বত্য চট্টল ত্যাগের মাঝে এরূপ প্রতিশ্রæতি রয়েছে।তিনি কীর্তির চেয়ে মহান,তিনি আপন মহিমায় ভাস্কর।হীনমস্যতা তাঁর মাঝে কোন সময়েও প্রশ্রয় পায়নি।পার্বত্য চট্টল ত্যাগে তাঁর মন ভারাক্রান্ত ছিল।তবে মনের বিশালতা হারান নি।বিদায়ের আয়োজনেও ছিল সৃষ্টির সম্ভাবনা।শিষ্যদের কর কমলে অর্পণ করে আসলেন আর একটি সৃষ্টির সম্ভাবনা।সেটা হলো রাঙ্গামাটি শহরের অদূরে ভেদভেদি এলাকায় অবস্থিত তখনকার সময়ের দশ সহ¯্র মুদ্রায় ক্রয়কৃত মোনঘর শিশুসদনের জমিখন্ড।বোয়ালখালী পার্বত্য চট্টল অনাথ আশ্রম থেকে নিজের হাতে গড়া শিষ্যদের দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পার্বত্য অঞ্চলের বর্তমান বাতিঘর রাঙামাটির মোনঘর অনাথ আশ্রম। শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম বিমলতিষ্য, প্রজ্ঞানন্দ, শ্রদ্ধালংকার সহ সবার অক্লান্ত পরিশ্রমে আজকের মোনঘর প্রতিষ্ঠা করেন যা সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষার মশাল হয়ে জ্বলজ্বল করে বর্তমান দেদীপ্যমান সেখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে তাঁর লালিত স্বপ্নের সম্ভাবনাময় স্বপ্ন।ভক্তদের মাঝে তিনি পরিপূর্ণ।মেঘের ¤øান সূর্য।মেঘ শূন্যতায় ভাস্কর।গিরি কোলে জ্ঞানশ্রী ছায়াকে অন্তরাল করে নিজের উদারতা আর দূরদর্শীতার পরিচয় দিয়েছিলেন।তাঁর সেই বিবেচনা তাঁকে করেছে মহীয়ান।সূর্যের বিচ্ছুরিত রশ্মির মত তাঁর আশীর্বাদ সকলের তরে সর্বত্র কামী।তাই তাঁর কীর্তির মহিমা গিরিকোলে ভাস্কর।প্রসংশিত ভদন্ত জ্ঞানশ্রী যুগমানবের সারিতে।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘ ১৮ বছর অবস্থান করে সেখান কার আদিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার বীজ বপন করে দিয়েছেন।তাই তিনি আদিবাসীদের নিকট প্রবাদপ্রতিম মহাপুরুষ, প্রবাদপ্রতিম মহাগুরু,আলোর দিশারী,তিনিই সদ্ধর্মাদিত্য।তিনি ছাড়া পার্বত্য শিক্ষার ইতিহাস অসম্পূর্ণ, তিনি ছাড়া আদিবাসী শিক্ষিত সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অসম্পূর্ণ।তৎকালীন পার্বত্য আদিবাসী সমাজ তারই শিক্ষা নির্দেশনায় এতটুকু আসতে পেরেছে।পাহাড়ী চট্টলার গিরিকোল মুবাইছড়ি ও মায়ানি ভ্যালির দেড় যুগ ধরে অবস্থান করা সোনালী সময়গুলোতে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন সে সকল প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে আসা অসংখ্য শিষ্য মন্ডলীর মাঝে যাঁরা উল্লেখযোগ্য তাঁদের একটি তালিকা নিম্নে সন্নিবেশিত হলো:-
১।শ্রীমৎবিমলতিষ্য মহাথেরো (জন্মস্থান:মায়ানী উদাল বাগান)
২।উপসংঘরাজ শ্রীমৎ প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো ( :মায়ানী দীঘিনালা)
৩।শ্রীমৎ শ্রদ্ধালংকার মহাথেরো ( :কাটারং ছড়া)
৪।শ্রীমৎবোধিপাল মহাথেরো ( :মায়ানী বরাদম)
৫।শ্রীমৎ সাধনমিত্র স্থবির ( :জলদী,বাঁশখালী)
৬।শ্রীমৎ ধর্মজ্যোতি ভিক্ষু ( বোয়ালখালী)
৭।শ্রীমৎ বোধিপাল ভিক্ষু ( বোয়ালখালী)
ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের পার্বত্য অঞ্চলে একদিকে সাধারণ শিক্ষার আলো জ্বেলে দিয়েছেন আরেকদিকে বনভান্তেকে উপসম্পদা প্রদান করে আদিবাসী সমাজে পারমার্থিক মার্গের পথ সুগম করে দিয়েছেন।সর্বোপরি পার্বত্য আদিবাসী বৌদ্ধ সমাজ সর্বদিকে এই মহাপুরুষের নিকট চির ঋণী.
---ঃঅসুস্থ গুরুদেব গুনালংকারের পাশে ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীঃ --- বিশাল বপু আর জলদ গম্ভীর কন্ঠস্বর আতিথেয়তায় অতুলনীয় ভক্তগণের হৃদয়াসনে আচার্য গুণালংকার যে দিন অসুস্থ হয়ে শয্যাহত হলেন,হয়তোবা কেউ তখন বিশ্বাস করতে পারেনি তা হবে তাঁর অন্তিম শয্যা।শাসনের কল্যাণকামী চষে বেড়িয়ে তিনি তুচ্ছ করেছিলেন নিজের আরাম আয়াসকে।তিনি শাসনহিতে ত্যাগের পরাকাষ্টা
প্রদর্শন করে শাসনধ্বজ অভিধায় অভিষিক্ত হয়েছিলেন।ভক্তগণের হৃদয় কন্দরে তিনি স্থান করে নিতে পেরেছিলেন অতি গভীরে।
রোগশয্যায় তিনি অত্যন্ত অসহায় বোধ করেছিলেন।তিনি অন্তরে অন্তরে উপলব্ধি করেছিলেন বুদ্ধের সেই অমোঘ বাণী কতসত্য,দিবাকরের তারুণ্যের লগ্নে বিচ্ছুরিত রশ্মির উজ্জ্বলতায় কত ভাস্কর –‘‘আরোগ্য পরম লাভা।”তিনি তখন বুঝতে পেরেছিলেন সময়ের দাবী মিটানো আর তার পক্ষে সম্ভব নয়।প্রিয়জনের সান্নিধ্য লাভ করার ইচ্ছা তাঁর মাঝে প্রবল হতে প্রবলতর হতে লাগলো।একে একে শিষ্যগণের আগমনে তাঁর শয্যার আশপাশ ভরে উঠলো।প্রিয়জনেরা শুনালেন তাঁকে শান্ত¡নার বানী,আশ্বস্থ করলেন তাঁকে ভরসা দিয়ে।কিন্তু কিছুতেই এ রোগ সেরে উঠার নয়।দিনে দিনে আচার্য গুণালংকারের শারীরিক অবস্থা অবনতির দিকে চললো।আচার্য গুণালংকারের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়লো সমগ্র বৌদ্ধ সমাজ,সমতল আর পহাড়ী অঞ্চলে।খবর পেয়ে প্রিয় শিষ্য জ্ঞানশ্রী ও পাহাড়ী চট্টলার মায়ানী ভ্যালির বোয়ালখালীর দশবল রাজবিহারে তাঁর নিরলষ কর্তব্য কাজে অবিচল থাকতে পারেন নি।ছুটে আসলেন গুরুদেবের শয্যার পাশে।চিকিৎসার্থে আচার্য গুণালংকারের জোবরায় অবস্থান,জোবরা থেকে চট্টগ্রাম শহর,চট্টগ্রাম শহর থেকে ঢাকা,ঢাকা থেকে জোবরা এই আসা যাওয়ার আর চিকিৎসার ব্যয় ভার যে কত বিপুল তা অনুমান সাপেক্ষ।কিন্তু টাকার অভাব হয়নি।অগণিত ভক্তের উজাড় করে দেয়া দানের ¯্রােতে টাকার অভাব থাকলো না,চিকিৎসার ত্রুটি হলো না কিন্তু আচার্য গুণালংকারের কর্মের স্রোত ধারা নিয়ন্ত্রণ করাতো কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী তাঁর অপরিমিত প্রত্যয় আর স্বজনের মমতা দিয়ে শুশ্রূষা করে চলেছেন গুরুদেবের।উদ্দীপিত হলো ভক্তগণের জ্ঞান পুন: আচার্য গুণালংকার সঞ্জীবনী শক্তি ফিরে পাবেন এই ভেবে।কিন্তু সকলের আশা ভরসার প্রত্যয়কে ধূলিসাত করে দিয়ে আচার্য গুণালংকারের অবস্থা ক্রমশ: অবনতির দিকে যাচ্ছিলো।সবাই বুঝতে পারলো সময়ের শেষ পালা সমাগত।সংসারের এ অলঙ্ঘনীয় বিধানের কারও প্রতিবাদ চলে না,প্রতিবাদ করতেও পারে না।নীরবে মেনে নিতে হয়।ভদন্ত জ্ঞানশ্রীও মেনে নিতে বাধ্য হলেন গুরুদেবের অন্তিম সময়কে।এক মূহুর্তে সমস্বরে সবাই উচ্চারণ করলো “অনিচ্চা বত সংখারা,উপ্পাদ বযধম্মিনো”।
কর্মের গতিধারায় আজ প্রমানিত সত্য এই যে,আচার্য গুণালংকারের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার প্রত্যয় নিয়ে সেদিন গুরুদেবের অন্তিম শয্যার পাশে ভদন্ত জ্ঞানশ্রী ছিলেন শপথ দৃপ্ত পরম সহিচ্ঞু এক স্বজন।গুরুদেবের শেষ কৃত্যানুষ্ঠান সমাপ্ত হলো।তখন ১৯৬৩ ইংরেজি সাল।তিনি ফিরে গেলেন কর্মস্থলে গিরি কোল আশ্রিত মায়ানী দশবল রাজ বিহারে পার্বত্য চট্টল অনাথ আশ্রমে।
---ঃআবার সমতলে ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীঃ---
ভদন্ত জ্ঞানশ্রী পাহাড়ী চট্টলার মুবাইছড়ি ও মায়ানী ভ্যালিতে পিছিয়ে পড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে দেড় যুগ ধরে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন।জ্ঞানোদয় পালিটোল,ধর্মোদয় পালি কলেজ এবং পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে সমসাময়িক কালে তিনি অপ্রতিদ্বন্ধী সংগঠক হিসাবে পরিচিত হলেন।তাঁর সৃজনী শক্তির প্রকৃষ্ট স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হলেন। আবার সমতলের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর জীবন ধর্মীয় চেতনা উন্মেষে কাজ করতে মনস্থ হন।সে লক্ষ্যে তিনি ১৯৭৫ খৃষ্টাব্দে পার্বত্য অঞ্চলে তার প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান,অনাথ আশ্রম সমূহ ইত্যাদির দায়িত্বভার শিষ্য প্রশিষ্যদের বিশেষ করে বিমলতিষ্য ও প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষুকে বুঝিয়ে দিয়ে আবার সমতলে ফিরে আসেন।
সংঘরাজ ভিক্ষু মহামন্ডল ভিক্ষু সংঘের একটি শক্তিশালী সংগঠন।সমতলে প্রত্যাবর্তন করার পর তিনি মহামন্ডলের উন্নয়নকল্পে পরিকল্পনা হাতে নেয়ার চিন্তা করলেন।ইতিমধ্যে মহামন্ডলের তরুণ ভিক্ষুদের মধ্যে শীল বিনয় অনুশীলনে ঘাততি দেখা দিয়েছিল।উল্লেখ্য যে মহামন্ডলের সদস্যভুক্ত সংঘ সব সময়েই শীল বিনয় অনুশীলনের ক্ষেত্রে অনন্য।তিনি মনোনিবেশ করলেন মন্ডলের সাংগঠনিক কাঠামো সুদৃঢ় করার জন্য।তৎপরে ফিরিয়ে আনলেন সুশৃঙ্খলা।জাগরণ শুরু হলো।তারণ্যের বিক্ষিপ্ত ভাবনায় যাঁরা দিশেহারা গৈরিক জীবনে পথ পেলো তাঁর সুশৃঙ্খল ভাবনায় নির্দেশিত কর্মসূচীর মাধ্যমে।তখন ১৯৭৫ ইংিেজ সাল জুন মাস।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী রাউজান থানার কদলপুর সুধর্মানন্দ বিহারে অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত হয়ে অবস্থান শুরু করলেন।বিহারের উন্নয়ন ও কর্মকাÐ বিস্তারের লক্ষ্যে কদলপুরে মুষ্টি চাউল উত্তোলন প্রথা পুনরায় চালু করেন।
--ঃসংঘরাজ ভিক্ষু মহামন্ডল ধর্মীয় শিক্ষা পরিষদ ও ধর্মায়তন প্রতিষ্ঠাঃ-- সংঘরাজ ভিক্ষু মহামন্ডল –ফটিকছড়ি,হাটহাজারী,রাউজান,সিটি কর্পোরেশন এলাকা,সীতাকুন্ড,মিরসরাই এবং নোয়াখালী ও নোয়াখালী ও কুমিল্লার সমগ্র বৌদ্ধ অঞ্চল নিয়ে গঠিত। মহামন্ডল অঞ্চলে পঁচাত্তরটি বিহার প্রতিষ্ঠাপিত আছে।এবার ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহামন্ডলের অভ্যন্তরে সংস্কারের কাজ শুরু করলো। সূচিত হলো শাসন সমাজের প্রভূত কল্যাণ।ভদন্ত জ্ঞানশ্রীর কর্মশক্তি অনুকূল পরিবেশে বিকশিত হতে থাকলো।স্বীকৃতি আসলো। বছরের শেষের দিকে তার কর্মউদ্যোগের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৭৬ সালে বিপুল ভোটের ব্যবধানে ভদন্ত শাক্যবোধি মহাথেরকে হারিয়ে বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহামন্ডলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাবান সাধারণ সম্পাদক পদে তিনি নির্বাচিত হন। ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহামন্ডলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর প্রতিটি বিহার কেন্দ্রিক উন্নয়ন কর্মকান্ড এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা হাতে নিলেন।এই পরিকল্পনাগুলোর মূল আদর্শে বৌদ্ধ দর্শন প্রভাবিত ছিলো এটাই হলো বৈশিষ্ট্য।ক্রমে মহামন্ডলের শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকলো।মহামন্ডলের ছায়াতলে তরুণ ভিক্ষুসংঘ উদ্দীপিত হলো,গড়ে উঠলো আরও অনেক সহযোগী সংগঠন।মহামন্ডলের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হওয়ার পর ঐ সময় মহামন্ডলের কাজকর্ম সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনার জন্য ১৫ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করে একটি তহবিল গঠন করে দেন যেখানে তিনি নিজেই ৬ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান করেন।
বছর দুই গড়িয়ে গেল।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী উপলব্ধি করলেন শাসন ও সমাজের কল্যাণ শুধু একক ভিক্ষুসংঘ অথবা একক দায়ক সংঘ দ্বারা সম্ভব নয়।উভয় পক্ষই সমাজ উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান।ইতিমধ্যে ভিক্ষুসংঘের মধ্যে তিনি প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে শৃঙ্খলা আনয়ন করেছেন।এইবার দায়কদের মধ্য থেকে তিনি খুজে বের করলেন বহুকর্মী।ভিক্ষুসংঘ আর দায়কদের যুগপৎ অংশগ্রহণের ভিত্তিতে স্থাপিত হলো মহামন্ডলের সহযোগী সংগঠন “'সংঘরাজ ভিক্ষু মহামন্ডল ধর্মীয় শিক্ষা পরিষদ'”।তখন ১৯৭৭ ইংরেজি সাল।উক্ত শিক্ষা পরিষদে তিনি ৬ লক্ষ টাকার একটি তহবিল গঠন করে দেন যেখানে নিজেই ১ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান করেন। ভদন্ত জ্ঞানশ্রীর নেতৃত্বে ছড়িয়ে পড়লো কর্মীরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে মহামন্ডল অঞ্চলের আনাচে কানাচে।পরিষদের আলো প্রবেশ করলো প্রতিটি পরিবারে।সাধারণ মানুষের সহযোগিতার দানে গড়ে উঠলো পরিষদের আর্থিক বুনিয়াদ।মহামন্ডল ধর্মীয় শিক্ষা পরিষদের কর্মসূচী হলো সমাজের আপামর শিশু সন্তাসদের ধর্মীয় শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে তোলা যা বৌদ্ধ সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা ও ধর্মীয় চেতনা সংস্কারের উন্নতি কল্পে বৌদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষার জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে।একই সাথে অনুশীলন করার জন্য ভিক্ষুদের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা গ্রহণ।যুগপৎ উভয় কর্মসূচী চলতে থাকলো। ধর্মীয় শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলার লক্ষ্যে প্রচলন করা হলো বার্ষিক ধর্মীয় বৃত্তি পরীক্ষা। মহামন্ডল এলাকার শত,শত শিশু,বালক,বালিকা ও কিশোর কিশোরী আকৃষ্ট হলো।প্রতিযোগিতায় অংশ নিলো।ধর্মীয় বিষয়াদি শিক্ষা করে অনেকে কছর বছর জিতে নিলো বৃত্তি।পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনে এই বৃত্তিসমূহ প্রদান করা হয়।ক্রমশ: পরিষদ ধর্মীয় শিক্ষা প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে অদ্বিতীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো।ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করলো সচেতন বৌদ্ধ সমাজের।অনুসরণীয় হলো এই প্রতিষ্ঠান বৌদ্ধ সংগঠকদের।মহামন্ডল এলাকাধীন প্রতিটি বিহারে প্রতিষ্ঠাপিত প্রভাতী পাঠশালা ধর্মায়তন বৌদ্ধ শিশুদের ধর্মাচরণ শিক্ষাদানে সমাজের যে প্রভূত উন্নতি সাধন করে চলেছে উশৃঙ্খলতার এই যুগে এই ব্যবস্থায় অভাবে হয়তো আরও বেশি অবক্ষয়ের ধ্বস নেমে আসতো অপ্রতিরূপ আমাদের এই ভূমিতে।
মুখপত্র বিহীন সংস্থার কর্মপ্রয়াস সাধারণের কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয় না।সত্য বিধৃত হলো কর্মবীর জ্ঞানশ্রী মহাস্থবিরের কাছে।তিনি মন্ডল ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান সমূহের কার্যক্রম,আদর্শ ও লক্ষ্য জন সমক্ষে প্রচারের মাধ্যম হিসেবে একটি মুখপত্র প্রকাশ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন।এই পরিকল্পনার সহযোগী হিসাবে এগিয়ে আসলেন পরিষদেও সদস্যবৃন্দ।প্রকাশিত হলো মহামন্ডল শিক্ষা পরিষদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রকাশনা বার্ষিকী"ধর্মায়তন"।কিন্তু মন্ডল ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান সমূহের ন্যুনতম কর্মসূচী প্রচার করার জন্য বছরের প্রান্তে ধর্মায়তনের প্রকাশনা অকিঞ্চিৎকর প্রমাণিত হলো।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী নিজ অর্থ ও সংগৃহীত দানের অর্থে গড়ে তুললেন তহবিল।পরিষদ বার্ষিকী মন্ডলের ত্রৈমাসিকে পরিণত হলো।ধর্ম ও জ্ঞান চর্চাও ক্ষেত্রে ধর্মায়তন অনন্য অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে।সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খবর পরিবেশন করে সমৃদ্ধ করে তুলছে মানুষের জানার পরিধিকে।সদ্য প্রতিষ্ঠিত সংঘরাজ ভিক্ষু মহামন্ডল ধর্মীয় শিক্ষা পরিষদের কর্মকান্ড শুরু হলো।
--ঃবাংলাদেশ ভিক্ষু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাঃ--
সময়ের প্রয়োজনে ধর্মীয় শিক্ষা পরিষদ ও ভিক্ষু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পৃথক পৃথক কর্মসূচীতে কাজ শুরু করলো।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী বৌদ্ধ শাসনের অবক্ষয় রোধকল্পে দেশের অভ্যন্তরে কোন পরিকলপনা গ্রহণ করা যেতে পারে কিনা চিন্তা ভাবনা শুরু করলেন।বিশ্বে বৌদ্ধ প্রতিরূপ দেশ তথা শ্রীলংকার অনুসরণে অবশেষে তিনি ভিক্ষু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করলে।ভিক্ষু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কর্মসূচী যৌথভাবে ধর্মীয় শিক্ষা পরিষদের সাথে কার্যকর হবে না মনে করে তিনি এটাকে আলাদাভাবে চিন্তা করলেন।ফলশ্রæতিতে ১৯৮৩ খৃঃ কদলপুর সুধর্মানন্দ বিহার সংলগ্ন বাংলাদেশ ভিক্ষু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন।এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনার জন্য শ্রীলংকায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদীয়মান ভিক্ষু প্রজ্ঞাবংশ ও ভিক্ষু এইচ সুগতপ্রিয় মহোদয়গণকে দায়িত্ব অর্পণ করেন।বর্তমানে এই ভিক্ষু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সার্বিক তত্ত¡াবধানে নিয়োজিত আছেন এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মবীর শাসনরক্ষিত মহাথের।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী তাঁর সঞ্চয়ের বিরাট একটি অংশ এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের তহবিল গঠনকল্পে দান করেছেন। বিনয়ী ভিক্ষু সংঘের পরিচালনায় এই প্রশিক্ষন কেন্দ্র বাংলাদেশী বৌদ্ধদের একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছে।এই প্রশিক্ষন কেন্দ্র হতে শিক্ষার্থীরা বিশ্বের বিভিন্ন বৌদ্ধ প্রতিরূপ দেশে ধর্ম বিনয় শিক্ষার উদ্দেশ্যে বর্তমানে ছড়িয়ে আছেন। কদলপুরে তার প্রতিষ্ঠিত অনাথ আশ্রম ও ভিক্ষু ট্রেনিং সেন্টার তার জীবনের এক অনন্য সৃষ্টি।এখান থেকে বহু ছাত্র উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজ ও জাতির সেবা করে যাচ্ছে আর বহু ভিক্ষু প্রশিক্ষিত হয়ে সংঘ সমাজে নন্দিত হয়ে দিকে দিকে বুদ্ধের অমৃতবাণী প্রচারে রত রয়েছেন।তিনি তাদের সকলের শিক্ষক ও গুরু হিসেবে ভিক্ষু গৃহী উভয় সমাজের নিকট সম্মানের রাজমুকুট অর্জন করে চিরকালের জন্য হয়ে খ্যাত হয়ে গেলেন মহাগুরু,মহা আচার্য হিসেবে।তারই কর্মের স্মারক হিসেবে সংঘরাজ ভিক্ষু মহামন্ডল কর্তৃক ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দের ২২ শে মার্চ কদলপুর সুধর্মানন্দ বিহারে এই মহামনীষীর ৬৭ তম হীরক জন্মজয়ন্তী মহাসমারোহে উদযাপিত হয়।
কদলপুরে দীর্ঘ ১১ বর্ষা অবস্থানকালীন এখানে একে একে গড়ে তুলেছেন অনাথ আশ্রম, ভিক্ষু ট্রেনিং সেন্টার, স্কুল ইত্যাদি।
--ঃসমাজ উন্নয়ন ও ভদন্ত জ্ঞানশ্রীঃ--
অব্যাহত প্রয়াসের ধারায় ভদন্ত জ্ঞানশ্রী দিনে দিনে পরিকল্পনা পেশ করে চলেছেন।শিষ্য প্রশিষ্য আর ভক্ত গণের কর্মোদ্দীপনার বিশাল আয়োজনে তিনি আগ্রহী হলেন,স্বনির্ভর আর্থ সাাজিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে।মুষ্টি চাউল আহরণ তাঁর এই কর্মসূচী বাস্তবায়নে অত্যন্ত ফলপ্রসূ হলো।যাঁরা এই কর্মসূচীর সফল বাস্তবায়নে এগিয়ে আসলেন তাঁরা ভাগ্যবানদের কাতারে গণ্য হলেন।উন্নতি হলো তাদের বিহার ও সংলগ্ন প্রতিষ্ঠান গুলোর।যাঁরা বাস্তবায়নে সক্ষম হলেন না তারা পিছয়ে থাকলো।বিভিন্ন সভায় ও বৈঠকী আলাপে তাঁর মুখ থেকে শুনা পরিকল্পনাটি সমাজের জ্ঞাতব্য মনে করে নিম্নে লিপিবদ্ধ করা হলো:-ক)উন্নয়ন তহবিলের উৎস :মুষ্টি চাউল আহরণ
খ)আহরণের এলাকা :
গ) বিহারের সংখ্যা :
ঘ)আবাসিক ভিক্ষুর অবস্থানযোগ্য বিহারের সংখ্যা :
ঙ)পরিবারের সংখ্যা :
চ)সাপ্তাহিক মুষ্টি চাউল আহরণের পর সংগৃহীত বাৎসরিক
তহবিল :
ছ)তহবিল ব্যয়ের সূত্র : ১)আয়ের এক তৃতীয়াংশ মহামন্ডলের তহবিলের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
২)দুই তৃতীয়াশ স্ব স্ব বিহার ও সংলগ্ন সংগঠন সমূহের উন্নয়নে ব্যয় করার জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
পরমুখাপেক্ষী জাতীয় বাজেটের ৮৭ শতাংশ ঋণের দ্বারা যেই দেশের রাষ্ট্র পরিচালিত হয় স্বাভাবিকভাবেই সে জাতিস্বাধীনভাবে বিচরণ করতে সক্ষম নয়।অথচ ক্ষুদ্র একটি জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ জনসাধারণের জন্য এই ধরণের স্বনির্ভর একটি প্রকল্প বস্তুত: পক্ষে স্বনির্ভরতা শুধু নয় আত্ম মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে নিজেদের মান সমুন্নত রক্ষার প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্প একটি অনুকরণীয় কর্মসূচী।
অবক্ষয়! অবক্ষয়!চারিদিকে শুধু অবক্ষয়!দারিদ্র প্রপীড়িত দেশ সমূহের তালিকার শীর্ষে আমাদের অবস্থান।উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা সাহায্যের মুখাপেক্ষী।বন্ধু সমূহ আমাদের সাহায্য করে।তবে বিনিময় ছাড়া সে সাহায্য আমাদের হাতে পৌঁছায় না।স্বনির্ভরতার এই কর্মসূচী শুধু বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর জন্য নয়,সমগ্র জাতির জন্য এক অমূল্য পথ নির্দেশ।ভিক্ষার ঝুলি কাঁদে উত্তমর্ণের কাছে সত্বা বিকিয়ে দেয়ার হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার এক অমোঘ রক্ষা কবচ।সাহায্যের অন্তরালে প্রবাহমান অবক্ষয়ের ¯্রােতধারা বনাধ করার লক্ষ্যে দৈন্যদশা প্রপীড়িত সমাজের আকাঙ্খাই হোক এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরম প্রত্যাশা।তাতে স্বনির্ভরতা আসবে।মুক্তি পাবে সমাজ ও দেশ অর্থনৈতিক সংকট থেকে।
উন্নয়নের জন্য স্বনির্ভরতার পরিকল্পনা দিয়ে তিনি সমাজের দিকে কেবল তাকিয়ে থাকলেন না,নিজ দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন স্বীয় সঞ্চয়ের অর্থদ্বারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠন গড়ে তোলার সহায়ক ভূমিকা গ্রহণ করে।ক্ষেত্র খুঁজতে শুরু করলেন নিজের সঞ্চিত অর্থ কাজে লাগানোর।তাঁর গুরুদেবের আজীবনের বাসস্থান জন্মভ’মি জোবরায় ১৯৮০ ইংরেজি সালে প্রতিষ্ঠিত হলো জোবরা বৌদ্ধ ফিডিং এন্ড হোস্টেলিং সেন্টার।বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন লাভার্থে এই সেন্টারের জন্য প্রয়োজন হলো জমির।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী এগিয়ে আসলেন।তাঁর গুরুদেবের নামে ফিডিং এন্ড হোস্টেলিং সেন্টারের নাম পরিবর্তন করার শর্তে তিনি প্রায় ১২ গন্ডা জমি ক্রয় করে দানপত্র লিখে দিলেন।১৯৮২ ইংরেজি সালে এই প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে জোবরা গুণালংকার বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম রাখা হলো।আশ্রম সরকারের অনুমোদন লাভ করলো।উক্ত আশ্রমে বহুসংখ্যক বৌদ্ধ অনাথ ছাত্র লেখাপড়ায় উচ্চশিক্ষিত হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।বৌদ্ধ অনাথ ছাত্রবৃন্দ সাধারণ পড়াশোনার সাথে সাথে ধর্ম বিষয়ও শিক্ষা করতে থাকে।বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠান থেকে শ্রীলংকা ও শ্যাম দেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য দুইবারে সাত পাঁচ জন করে শ্রামণ প্রেরণ করা হয়েছে।বর্তমানে শতাধিক দু:স্থ ও অনাথের ভরণ পোষণ করে এই অনাথের ভরণ পোষণ করে এই প্রতিষ্ঠান সমাজে অনন্য ভূমিকা পালন করে চলেছে।
---ঃবিশ্ব শান্তি প্যাগোডা প্রতিষ্ঠাঃ---
সময়ের কিছু মাত্র ব্যবধানে তাঁর নেতৃত্বে সংঘরাজ ভিক্ষু মহামন্ডল জোবরা গ্রাম বাসী হতে অত্র অঞ্চলে বৌদ্ধদের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যে ধারক কেয়াং টিলার জমি দান গ্রহণ করলেন।সেখানে প্রতিষ্ঠা করলেন একটি বৌদ্ধ মন্দির।এই মন্দিরকে সুপ্রতিষ্ঠিত ও প্রসারিত করার জন্য তিনি খুঁজে বেড়ালেন একজন বিদগ্ধ সংগঠক।তিনি প্রার্থনা জানালেন পন্ডিত প্রবর শান্তির কান্ডারী শ্রীমত জ্যোতি:পাল মহাস্থবীর মহোদয়কে এই মন্দিরে অবস্থান করার জন্য।পন্ডিত প্রবর সতীর্থের এই আহবান কে স্বাগত জানালেন।তিনি অবস্থান শুরু করেন ছোট্ট এক প্রকোষ্ঠে।শ্বাপদ সংকুল টিলার জঙ্গলের মাঝখানে এই প্রকোষ্ঠে বসবাস করে তিনি পরিকল্পনা ব্যক্ত করলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এই সম্ভাবনাময় কেয়াং টিলার উন্নয়ন কর্মসূচীর।এই মন্দিরের নামকরণ করলেন বিশ্বশান্তি প্যাগোডা।অগ্রসর হলো উন্নয়নের কাজ।বৌদ্ধ দানশীল ব্যক্তিদের সহায়তায় গড়ে উঠলো এক একটি স্থাপত্য।পন্ডিত জ্যোতি:পাল মহাথেরোর এই স্থাপত্য কীর্তির সুউচ্চ চূড়া কপোত সদৃশ শুভ্রতার ঝলমল আলোর ঈশারায় ভদন্ত জ্ঞানশ্রীর সাংগঠনিক কর্মধারাকে মহীয়ান করে তুলেছে,বাড়িয়ে তুলেছে তার পরিসর।
আশির দশকে ভদন্ত জ্ঞানশ্রী তাঁর স্বীয় দানের মহিমায় উজ্জ্বল।একের পর এক করে প্রতিষ্ঠান সমূহ প্রতিষ্ঠা করলেন।জরাজীর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে সঞ্চার করলেন সজীবতা।সংঘরাজ ভিক্ষু মহামন্ডলের দৈন্যদশায় পীড়িত হয়ে তিনি ১৯৮৪ ইংরেজি সালে দান করলেন প্রচুর অর্থ।সংগ্রহ করলেন আরও দানের অর্থ।আড়াই হাজার টাকার তহবিল স্ফীত হয়ে দুই লক্ষের কোটায় পৌঁছলো।এ যেন পরশ পাথরের ছোঁয়ায় এক একটি সংগঠন এক একটি কল্যাণ মূর্তিতে শাসন ও সমাজের ধ্বজা বহন করে চলতেশুরু করেছে নব নব অভিযাত্রায়।শাসন ও সমাজের এই অভিযাত্রার মাঝে ভদন্ত জ্ঞানশ্রী থাইল্যান্ড থেকে ঘোষিত হলেন শাসন শোভন জ্ঞানভানক অভিধায়।
সদ্ধর্ম ও জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে তিনি শুরু করলেন ভিক্ষু সংঘের চরিত্র গঠনের প্রক্রিয়া।সেই লক্ষ্যে তিনি প্রতিরূপ দেশের ধর্ম চর্চা ও জ্ঞান আহরণের বিভিন্ন প্রচেষ্টার সাথে তরুণ ভিক্ষু ংঘের পরিচিতি লাভ করা প্রয়োজন মনে করলেন।ভিক্ষু শ্রামণ প্রশিক্ষণার্থীদের শ্রীলংকা ও শ্যামদেশে প্রেরণের ব্যবস্থা করলেন।এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে ভিক্ষু সংঘের মজবুত চারিত্রিক ভিত তৈরী করাই হলো মুখ্য উদ্দেশ্য।দেশ ও বিদেশে জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় রোধের সুদৃঢ় প্রত্যয় জন্মাবে।এতে ক্রমে শাসনের পরিসর বৃদ্ধি পাবে।১৯৮৫ ইংরেজী সালে ভিক্ষু ও শ্রামণ প্রশিক্ষণার্থীদের বিদেশ গমণ উপলক্ষে তিনি নিজের অর্থ ব্যয় করলেন প্রচুর।তাঁর অর্থানুকূল্য ব্যতীত এই পরিকল্পনা সফলতার দ্বার প্রান্তে পৌঁছতে সক্ষম হতো না।দিনে দিনে এই প্রচেষ্টার বর্ধিত পরিসরে স্বার্থ গন্ধ বিহীন নিষ্কলুষ ধর্মীয় চেতনার উন্নতি উন্নতি শাসন ও সমাজের প্রভূত কল্যাণ বয়ে আনতে সক্ষম।তাঁর অর্থ আর প্রচেষ্টা যুগপৎ মন্ডলীর প্রতিষ্ঠানসমূহ স্থাপনায় এক বিরাট অবদান সৃষ্টি করে চলেছে অলক্ষ্যে,অচিন্তনীয়ভাবে।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী সফলতার মাপ কাটিতে অনুত্তর পুরুষ।
১৯৮৬ সালে ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথেরো কদলপুর থেকে চলে আসলেন গুরুর জন্মজনপদ জোবরা গ্রামে। ভিক্ষুজীবনের মূল্যবান ৩ টি বর্ষা তিনি জোবরা সুগত বিহারে অবস্থান করে ১৯৮৯ সালে মির্জাপুর গৌতমাশ্রম বিহারে অধ্যক্ষ হলেন।বিহারের দায়িত্ব নিয়ে তিনি শুরু করে দিলেন বিহার উন্নয়নের।তখনকার সময় তিনি বিস্কুটের ১ টি করে টিন ও নারিকেলের মালা(মুষ্টি চাউল নেওয়ার) পাড়ার ছেলেদের তোলার দায়িত্ব দিতেন।সে মুষ্টি চাউল সংগ্রহ করে তারা ভান্তের কাছে জমা দিতো। মুষ্টি চাউলের বিক্রয় লব্ধ অর্থ দিয়ে মির্জাপুর গৌতমাশ্রমে ভিক্ষু নিবাস ও সিংহ শয্যা বুদ্ধমূর্তির কক্ষ নির্মাণ করতে সক্ষম হলেন ঊনারই শিষ্য শাসনানন্দ ভিক্ষুকে দিয়ে।গৌতমাশ্রম বিহারে দায়ক দায়িকাদের মধ্যে চালু করেন প্রাতঃ ও সন্ধ্যা বন্দনা।
--ঃকর্ণফুলী নালন্দা বিহার ও জ্ঞানশ্রী শিশু সদন প্রতিষ্ঠাঃ--
কর্ণফুলী নালন্দা বিহার প্রতিষ্ঠাকল্পে ভদন্ত জ্ঞানশ্রীর গৃহীত পদক্ষেপ কাপ্তাই চন্দ্রঘোনায় কর্মব্যপদেশে অবস্থানরত বৌদ্ধদের ধর্মীয় প্রেরণার উজ্জীবনে এক অভূতপূর্ব সংযোজন।১৯৮৯ ইংরেজী এই বিহার প্রতিষ্ঠা করা হয়। কর্ণফুলী পেপার মিল কর্তৃপক্ষ অধুনা মসজিদের ইমামের সমমর্যাদার বেতন কাঠামোর বিপরীতে বিহারাধ্যক্ষ নিয়োগ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।এই স্বায়ত্তশাসিত কর্তৃপক্ষের বৌদ্ধধর্মের প্রতি এরূপ মর্যাদা প্রদর্শনের দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে বিরল।এই দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের ভাবীকালের বৌদ্ধদের ধন্যবাদার্হ।সাথ সাথে ভদন্ত জ্ঞানশ্রী কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করলেন সমগ্র বৌদ্ধ সমাজকে।
এই কালজয়ী মহাপুরুষ সংঘের নির্দেশে মির্জাপুর গৌতমাশ্রম বিহারে ২ বর্ষা অবস্থান করেন।অতঃপর ঢাকায় অবস্থানরত ভদন্ত শান্তপদ ভান্তের প্রয়ান হলে মির্জাপুর গৌতমাশ্রমে ২ বর্ষা অবস্থান করে চলে যান ঢাকা মেরুল বাড্ডা বৌদ্ধ বিহারে।তৎকালীন মহাসভার মহাসচিব ভদন্ত শান্তপদ মহাথের পূর্বে এই বিহারের অধ্যক্ষ ছিলেন।সংঘের নির্দেশে ডোমখালি থেকে প্রিয় শিষ্য শাসনানন্দ ভিক্ষুকে রেখে গেলেন মির্জাপুর গৌতমাশ্রম বিহারের দায়িত্বে।১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত দীর্ঘ ৪ বর্ষাবাস তিনি ঢাকা বাড্ডা আন্তর্জাতিক বিহারে অবস্থান করেন।সেখানেও তিনি তার কর্মপ্রচেষ্টা দ্বারা দাতা প্রতি একহাত/১ ফুট করে টাকা নিয়ে উক্ত বিহারের অবকাঠামো বৃদ্ধি করেন যা এখনো লোকে মুখে শুনা যায় তার সদিচ্ছার কথা।
১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪ বর্ষাবাস ঢাকায় অবস্থান শেষে ১৯৯৫ সালে সংঘের নির্দেশে ঢাকা থেকে চলে এলেন চট্টগ্রামে বিশ্বশান্তি প্যাগোডার হাল ধরার জন্য।বিশ্বশান্তি প্যাগোডার ভার নিয়ে সেখানে প্যাগোডা নির্মাণের জন্য ব্রতী হলেন।কিন্তু উন্নয়নে পারিপার্শ্বিক হাজারো সমস্যার কারণে মাত্র ২ বর্ষাবাস যাপন শেষে বিনাজুরী বাসীদের একান্ত আগ্রহে ১৯৯৭ সালে পুনরায় চলে আসতে হলো তার অনেক স্মৃতি ধন্য বিনাজুরী শ্মশান বিহারে যেখানে দায়ক দায়িকারা তাকে আজীবন অধ্যক্ষের আসনে পূজা করেন।বিনাজুরী এসেই বিনাজুরী শ্মশান বিহারকে নবরুপে সংস্কার করেন।এখানে ও একে একে প্রতিষ্ঠা করেছেন বিনাজুরী ধর্মকথিক অনাথ আশ্রম,পশ্চিম বিনাজুরী উচ্চ বিদ্যালয়,বিনাজুরী জ্ঞানশ্রী আন্তর্জাতিক ভাবনা কেন্দ্র ও বৃদ্ধাশ্রম।
শীলগুনে বিভূষিত,বিনয়ালঙ্কৃত এই মহান কর্মযোগী মহাপুরুষটি অনাথ ছেলেদের অনাদরে অবহেলায় পড়ে থাকতে যেন সহ্য করতে পারেন না।তাই তো তার কর্মবহুল জীবনে যেখানেই অবস্থান করেছেন সেখানেই অনাথ ছেলেদের জন্য রেখে দিয়েছেন আশ্রয় আর তাদের জন্য হৃদয়ে রেখে দিয়েছেন অপার স্নেহ ও মৈত্রী।
তাই ১৯৯৪ সালে পশ্চিম বিনাজুরীতে প্রতিষ্ঠা করেন ধর্মকথিক অনাথ আশ্রম যেখান থেকে হাজার হাজার অনাথ ছেলে ও অন্যান্য ছাত্র শিক্ষা লাভ করে জীবনে উন্নতি লাভ করেছে বিনাজুরী আশ্রমে প্রশিক্ষনার্থী ভিক্ষু শ্রমন দের দৈনন্দিন ব্রতকর্ম,বিনয়শীল জীবন আচরণ, নিয়মিত পিন্ডাচরন চালু করেছেন।এই বিনাজুরী ধর্মকথিক অনাথ আশ্রম ও ভিক্ষু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র যেন দ্বিতীয় কদলপুর ভিক্ষু ট্রেনিং সেন্টার।বর্তমানে এই আশ্রমের পরিচালকের দায়িত্বে আছেন তারই প্রিয় শিষ্য ভদন্ত শাসনানন্দ মহাথের।তিনিও আদিবাসী ছেলেদের সন্তানের মতই লালন পালন করেন। এখান থেকেই ভান্তের আদর্শে দীক্ষিত ও শিক্ষালাভ করে হাজার হাজার ভিক্ষু শ্রমন হয়ে দিকে দিকে ধর্মপ্রচারে রত আছেন।ভান্তের আর্থিক বদান্যতায় প্রতিষ্ঠা হয়েছে পশ্চিম বিনাজুরী উচ্চ বিদ্যালয় যেখানে ভান্তে প্রতিষ্ঠা কালীন সময়েও এককালীন ১ লাখ টাকারও অধিক দান দিয়ে স্কুলের প্রতিষ্ঠা তহবিল কে শক্তিশালী করে দিয়েছেন।বর্তমানে পশ্চিম বিনাজুরী উচ্চ বিদ্যালয় বিনাজুরী অঞ্চলে অন্যতম একটি শিক্ষা বিদ্যাপীঠ। এখান থেকেই প্রতি বছর বিনাজুরী আশ্রমের ছাত্র সহ এলাকার হাজার হাজার ছাত্র ছাত্রী পড়াশোনা শেষে জীবনে উন্নতি করেছে।প্রতিষ্ঠা করেছেন জ্ঞানশ্রী আন্তর্জাতিক ভাবনা কেন্দ্র যা বর্তমান সময়ে কাজ চলমান।২০১১ সালে বিনাজুরী শ্মশান বিহারে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক মানের হীরক জয়ন্তী অনুষ্ঠান।
---ঃবাংলাদেশ বুদ্ধ শাসন কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠাঃ---
তার জীবনের সমস্ত দান দক্ষিণার সঞ্চয় দিয়ে বুদ্ধ শাসনের কল্যাণের জন্য বিনাজুরী তে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ বুদ্ধ শাসন কল্যাণ ট্রাস্ট।
---ঃত্রিপিটক প্রচারে ভদন্ত জ্ঞানশ্রীঃ---
জ্ঞান চর্চা মানুষকে অসীমের পথ নির্দেশ করে।এই জন্য নিবিড় কর্ম শক্তির প্রয়োজন।পাহাড়ে,সমতলে যেখানেই তিনি পদার্পণ করেছে তিনি একাধারে পর্যটক,ধর্মপ্রচারক,সমাজ সংস্কারক ও সংগঠকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।এরূপ কর্মব্যস্ততার মাঝে তিনি নিজের লেখনীকে থামিয়ে রাখেন নি।রাউজান বিমলানন্দ বিহারে অবস্থান করার সময় জাতক পরিষদের সান্নিধ্যে থেকে তাঁর মধ্যে উপ্ত হয়েছিল বিপুল জ্ঞান বিপাসা।স্বধর্ম প্রসবিনী সমতলের চলমান পনের বছর ধরে ভদন্ত জ্ঞানশ্রীর জীবনের দিকগুলোর অভিসম্পাত করা হলো।তাছাড়াও স্বধর্মের ব্যবহারিক দিকগুলো নিয়ে তিনি তাঁর লেখনীচালনা করেছেন। কর্মযোগী ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের ১৯৬৪ খৃঃ সাহিত্যরতœ অষ্টম সংঘরাজ শীলালংকার মহাথেরোর সাথে যৌথ ভাবে গঠন করেন ত্রিপিটক প্রচার বোর্ড যা তার এক অনন্য কীর্তি।ত্রিপিটক প্রচার বোর্ড থেকে তাঁর লিখিত জাতকাবলীর অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিতহয়।এগুলো তাঁর গবেষণামূলক জ্ঞানচর্চার স্বাক্ষর বহন করে।ব্যবহারিক ধর্ম শিক্ষা প্রতিটি বৌদ্ধের জীবনে অপরিহার্য।নানা ঘাত প্রতিঘাত কাটিয়ে উঠে বৌদ্ধদের অবশিষ্টাংশ যারা বাংলাদেশে বসবাস করে তারা শুধু মাত্র ইতিহাসের স্বাক্ষ্য বহণ করছে।তাদের মধ্যে ধর্ম ও সামাজিক আচরণের সুস্পষ্ট অবক্ষয়ের ছাপ পরিলক্ষিত।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী এই ছাপগুলো দূরীকরণার্থে ভাবী বংশধরদের জন্য সম্পাদন করলেন বৌদ্ধ নীতিমালা ১ম ও ২য় ভাগ। অধুনালুপ্ত ত্রিপিটক প্রচার বোর্ড থেকে অষ্টম সংঘরাজ ও ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের'র লিখিত কালজয়ী বৌদ্ধ মনীষীদের জীবনীগ্রন্থ -বিশাখা, জীবক,আনন্দ,বৌদ্ধ নীতিমঞ্জরী আজও বৌদ্ধ সমাজে অতিমাত্রায় পঠিত ও সমাদৃত হয়ে আসছে।
---ঃশাসন পথিকৃৎ ভদন্ত জ্ঞানশ্রীঃ---
বিশ্ব চলমান।তাই সৃষ্টি হচ্ছে উত্তরাধিকার। স্বাভাবিকভাবেই জগত উত্তরাধিকার সৃষ্টির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে চলেছে। ভদন্ত জ্ঞানশ্রী সেই দৃষ্টিকোন থেকে উপযুক্ত উত্তরাধিকারের প্রবাহ সৃষ্টি করে নিজের অস্তিত্বকে সুদৃঢ় ভিতের উপর দাঁড় করাতে অন্য দশজন সমসাময়িক ভিক্ষুর তুলনায় অনেক এগিয়ে রয়েছেন।তিনি একের পর এক শিষ্যের প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা দিয়ে চললেন।সৃষ্টি হলো শিষ্য প্রশিষ্যদের প্রসারিত পরিমন্ডল।গিরিকোলে প্রকৃতির ছায়াঘেরা মায়া মমতায় পিতৃ¯েœহের পরশ দিয়ে যাঁদের যোগ্যতার অনুসারী হিসেবে স্বীয় প্রতিষ্ঠান সমূহের রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত করে তিনি সমতলে প্রত্যাবর্তন করেছেন,সেই সকল শিষ্যমন্ডলীর একটি তথ্যনির্ভর বিবরণ ইতিমধ্যে লিপিবদ্ধ করা হয়।এখানে মহামন্ডল এলাকায় অবস্থানরত তাঁর কীর্তিমান শিষ্যদের একটি বিবরণ এই পরিসরে লিপিবদ্ধ করা হলো:-
১।উপসংঘরাজ শ্রীমৎ প্রিয়দর্শী মহাথেরো (জন্মস্থান:কদলপুর)
২।শ্রীমৎ জিনানন্দ মহাথেরো (কদলপুর)
৩।শ্রীমৎ পূর্ণজ্যোতি মহাথেরো (রাঙ্গুনীয়া)
৪।শ্রীমৎ শাসনজ্যোতি স্থবির (গহিরা)
৫।শ্রীমৎ দেবমিত্র মহাথেরো (কোঁয়ার,লাকসাম)
৬।শ্রীমৎ শাসনানন্দ মহাথেরো (বিনাজুরী)
৭।শ্রীমৎ আর্যশ্রী মহাথেরো (গুমান মর্দন)
৮।শ্রীমৎ সংঘপ্রিয় ভিক্ষু (গহিরা)
৯।শ্রীমৎ দেবপাল ভিক্ষু (ধর্মপুর)
১০।শ্রীমৎ ধীরানন্দ মহাথেরো (কোঠেরপাড়)
১১।শ্রীমৎ সুভদ্রপ্রিয় ভিক্ষু (রাঙ্গুনীয়া)
১২।শ্রীমৎ শ্রদ্ধানন্দ ভিক্ষু (ধর্মপুর)
১৩।শ্রীমৎ বুদ্ধপ্রিয় ভিক্ষু (জোবরা)
১৪।শ্রীমৎ প্রজ্ঞাশ্রী ভিক্ষু (মধ্যম আধারমানিক)
১৫।শ্রীমৎ বিনয়ানন্দ ভিক্ষু (মধ্যম আধারমানিক)
১৬।উপসংঘরাজ শ্রীমৎ রতনশ্রী মহাথেরো (প: বিনাজুরী)
১৭।শ্রীমৎ প্রজ্ঞাশ্রী মহাথেরো (খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা)
১৮।শ্রীমৎ তিলোকপ্রিয় থেরো -লামা,বান্দরবান
১৯।শ্রীমৎ বিমলজ্যোতি থেরো- মধ্যম বিনাজুরী ধর্মাংকুর বিহার
২০। শ্রীমৎ ড: শরনপাল থের - কানাডা
২১। শ্রীমৎ ভদন্ত প্রিয়ানন্দ মহাথেরো - বিনাজুরী ,রাউজান
২২। শ্রীমৎ নন্দপ্রিয় মহাথের- খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা
২৩। শ্রীমৎ পূর্ণানন্দ থেরো- দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা
২৪। শ্রীমৎ ধীরবংশ থেরো -রোয়াংছড়ি,বান্দরবান।
২৫। শ্রীমৎ বুদ্ধরত্ন থের- উখিয়া,কক্্রবাজার
২৬। শ্রীমৎ বিমলজ্যোতি থেরো-দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা
২৭। শ্রীমৎ সংঘরত্ন থের- গুইমারা,খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা
২৮। শ্রীমৎ প্রজ্ঞাশ্রী থেরো- মির্জাপুর
২৯। শ্রীমৎ দেবরত্ন থেরো- থানছি,বান্দরবান পার্বত্য জেলা
৩০। শ্রীমৎ জ্ঞানালোক থের- গহিরা,রাউজান
৩১। শ্রীমৎ ডা: শীলরতœ ভিক্ষু- পটিয়া
৩২। শ্রীমৎ বিমলানন্দ ভিক্ষু-মছদিয়া,লোহাগাড়া
৩৩। শ্রীমৎ উপানন্দ ভিক্ষু-তুলাবাড়িয়া,দমদমা
৩৪। শ্রীমৎ সুশীলপ্রিয় ভিক্ষু-রংপুর
৩৫। শ্রীমৎ প্রিয়তিষ্য ভিক্ষু-কোঠেরপাড়
৩৬। শ্রীমৎ মুদিতানন্দ ভিক্ষু -আবুরখীল
৩৭। শ্রীমৎ জ্ঞানপ্রিয় ভিক্ষু- উখিয়া
৩৮। শ্রীমৎ শীলব্রত ভিক্ষু-আদারচর,লোহাগাড়া
---ঃউত্তরবঙ্গে ধর্মাভিযানঃ---
ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের ১৯৯১-১৯৯৪ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকা মেরুল বাড্ডাস্থ আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ হিসেবে অবস্থান করেন। ঐ সময় হতে উত্তরবঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের অতীত ঐতিহ্য,সভ্যতা,সংস্কৃতির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তৎপর হন।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথেরোর জীবনের অন্যতম মহান কীর্তি সুদূর উত্তরবঙ্গের রংপুর,দিনাজপুর,রাজশাহী,বগুড়া,জয়পুরহাট,ঠাকুরগাঁও,সিরাজগঞ্জ,নওগাঁর প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবলুপ্তপ্রায় বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীকে অতীত ঐতিহ্যের বৌদ্ধধর্মের সুশীতল ছায়াতলে পুনরায় আনয়ন করত উত্তরবঙ্গের হারানো বৌদ্ধ কৃষ্টি ঐতিহ্যকে আবার বিশ্বসমক্ষে উপস্থাপন করা।ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এক সময় বরেন্দ্রভূমি খ্যাত এ অঞ্চলসমূহে বৌদ্ধ ধর্মের বিজয় পতাকা সগৌরবে উড্ডীন ছিলো। কিন্তু রাষ্ট্রবিপ্লব এবং হতদরিদ্্র অবস্থার প্রেক্ষিতে সেই গর্বিত বৌদ্ধ সমাজের সোনালী দিনগুলো এক সময় অপসৃত হয়ে পড়ে।তাদের উত্তর পুরুষেরাও কালের এ করালগ্রাসের ঘৃন্য থাবা হতে নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি নানা সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষয়িক কারনে। কালক্রমে তারা বিভিন্ন আদিবাসীদের সংস্কারের সাথে অসহায়ভাবে যুক্ত হয়ে নিজেদের ধর্ম-কৃষ্টি সভ্যতাকে পর্যন্ত হারিয়ে ফেলতে বসেছিল।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের এতদঞ্চলের অবহেলিত হারিয়ে যেতে থাকা বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীকে তাদের শিক্ষাদীক্ষা ও আর্থসামাজিক সমস্যা গভীরভাবে অবলোকন পর্যবেক্ষন করে এক সময় দৃঢ়চিত্তে প্রগাঢ় মনোবল নিয়ে হতশ্রী অসহায় বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।তাদের প্রতি সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন ।স্বীয় বার্ধক্য,শারীরকি অসুস্থতাকে গুরুত্ব না দিয়ে তিনি সীমাহীন ধৈর্য্য ধারণ করে উত্তরবঙ্গের পিছিয়ে পড়া বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর পুনর্জাগরণে মঙ্গল কামনায় বৌদ্ধ ধর্মের মূল¯্রােতে তাদের আবার ফিরে আসার অদম্য ইচ্ছাকে বাস্তবে রুপ দিতে নিররসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।তিনি উল্লেখিত জেলাসমূহে পরিভ্রমণ করে অত্র অঞ্চলের আদিবাসীদের যারা একান্তভাবে বৌদ্ধধর্মের সেই সুশীতল ছায়াতলে জীবনযাপন করতে ইচ্ছুক তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের হিতার্থে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন ।তিনি প্রতি বছর নিয়মিত শীতকালে অবহেলিত দরিদ্র জনগনের মাঝে শতি বস্ত্র বিতরন করেন ।শ্রদ্ধেয় ভান্তে উত্তরবঙ্গে নি¤œলিখিত কার্যক্রম সমূহ সম্পাদন করেছেন:
১/জয়পুরহাট পাঁচবিবি উপজেলার উচাই সূর্যাপুর গ্রামে উপসঙ্ঘরাজ ড: জ্ঞানশ্রী বৌদ্ধ বিহার কমপ্লেক্্র প্রতিষ্ঠা
২/জয়পুরহাট নুরপুরে উপসঙ্ঘরাজ ড: জ্ঞানশ্রী বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা ও প্রভাতী ধর্মীয় শিক্ষার প্রবর্তন ।
৩/রংপুর মিঠাপুকুর বেনুবন বিহার সংলগ্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য অনাথালয় শিশুসদন প্রতিষ্ঠার্থে সাড়ে একত্রিশ শতক জমি পাঁচ লক্ষ টাকায় কিনে দান করেন ।
৪/বদরগঞ্জ নবশালবন বিহারের অবকাঠামোগত উন্নয়নে জমি ক্রয় করে দেন ।
৫/ঠাকুরগাঁও তক্ষশীলা বিহারের অবকাঠামোগত উন্নয়নে জমি ক্রয় করে দেন ।
৬/উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বিহার প্রতিষ্ঠান সমূহ রক্ষার্থে সর্বপ্রথম মুষ্ঠি চাউল উত্তোলন প্রথা প্রবর্তন করেন ।
৭/খুলনার বাগেরহাট একটি বিহার ও বরিশালের আখৈলঝরায় একটি বিহার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার কাজ চলমান...
---ঃচট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ পদ গ্রহণঃ---
১৯৯৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত দীর্ঘ ৫ বর্ষা পশ্চিম বিনাজুরী শ্মশান বিহারে অবস্থানের পর চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ সুবোধিরতœ মহাস্থবির প্রয়ান হলে ২০০২ সালে বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির প্রবল ইচ্ছার কারণে চট্টগ্রাম নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ পদে সমাসীন হলেন।শুরু হলো নাগরিক জীবনের চাকচিক্যময় অধ্যায়।চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারে এসেই তিনি শুরু করেন বিবিধ উন্নয়নমূলক কাজ আরম্ভ করেন।দু:খমুক্তির অন্যতম উপায় বিদর্শন সাধনা। ।এই বিহারে এসে তিনি মুক্তিকামী উপাসক উপাসিকাদের নিয়ে আরম্ভ করেন প্রতিদিন সন্ধ্যাকালীন বিদর্শন ধ্যান অনুশীলন। বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির চেয়ারম্যান দানবীর রাখাল চন্দ্র বড়–য়ার পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু করেন চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহার ভিক্ষু ট্রেনিং সেন্টার ও অনাথ আশ্রমের কার্যক্রম। ভান্তের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট হয়ে উপাসক উপাসিকারা দ্বিগুন উৎসাহে হয়ে উঠেন বিহারমুখী।শ্রদ্ধেয় ভান্তের অত্র বিহারে অবস্থানকালে বিহারের উন্নয়নমুখী বিবিধ কাজ শুরু হয়।২০০৮ সালে আরম্ভ হয় বিহারের পুনঃনির্মান কাজ ।
---ঃমাননীয় উপসংঘরাজ পদে অভিষেকঃ---
২০০৩ সালে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সাংঘিক পূন্যপুরুষ মহামান্য একাদশ সংঘরাজ পন্ডিত শাসনশ্রী মহাস্থবির মহাপ্রয়ান করলে ২৯ শে জানুয়ারী ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানের পূর্বরাত্রে বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার ৫৭ তম অধিবেশনে মহান সংঘের সর্বসম্মতিক্রমে উপসংঘরাজ ধর্মসেন মহাস্থবির মহামান্য দ্বাদশ সংঘরাজ পদে অভিষিক্ত হন।তিনি সংঘরাজ পদে অভিষিক্ত হলে উক্ত অধিবেশনে মহাসভার উপসংঘরাজ পদ শূন্য হয়ে গেলে সে শূন্যপদে শাসনশোভন ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাস্থবির মহোদয় মাননীয় উপসংঘরাজ পদে অভিষিক্ত হন।
----ঃ বিদেশ ভ্রমণঃ ---
শাসন পথিকৃৎ ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথেরো দেশে বিদেশে বিভিন্ন ধর্মীয় সভা সমে¥লন অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হয়ে যোগদান করে মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশে আলোকিত সমাজ গঠনে মহাকারুনিক বুদ্ধের সদ্ধর্মের অমোঘ বাণী প্রচার করে যাচ্ছেন। সম্মানিত অতিথি হয়ে ভ্রমণ করেছেন বহু দেশ।
তার মধ্যে ২০০৭ খৃস্টাব্দে মায়ানমার সরকারের আমন্ত্রনে মায়ানমার সফর করেন।
২০০৭ খৃস্টাব্দে সম্মানসূচক ডক্টর ডিগ্রী গ্রহনের জন্য থাই সরকারের আমন্ত্রনে থাইল্যান্ড সফর করেন।
২০০৮ খৃস্টাব্দে জাপানের রয়েল গ্র্যান্ড হল অব বুড্ডিজম এ অনুষ্ঠিত পঞ্চম বুড্ডিস্ট সামিট - ওয়ার্ল্ড বুড্ডিস্ট সুপ্রিম কনফারেন্সে যোগদান করেন।
২০১১ খৃস্টাব্দে শ্রীলংকান সরকারের বিশেষ আমন্ত্রনে শ্রীলঙ্কা সফর করেন।
২০১৯ খৃস্টাব্দে ধুতাঙ্গ সাধক ভদন্ত শীলানন্দ থের ভিয়েতনাম উপাসক উপাসিকাদের আমন্ত্রনে তারই পরম গুরু হিসেবে ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের মহোদয়কে ভিয়েতনাম সফরে নিয়ে যান। এছাড়াও শ্রদ্ধেয় ভান্তে বহুবার বিভিন্ন সংস্থার আমন্ত্রনে ভারত ও থাইল্যান্ড ভ্রমন করেন।
---ঃবিভিন্ন সম্মাননা ও অভিধায় অভিষিক্তঃ---
পার্বত্য চট্টগ্রামের বুদ্ধশাসন সদ্ধর্মে বনভান্তেকে উপসম্পদা দান তথা সেখানকার সমগ্র পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে দিয়ে তিনি সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলে সদ্ধর্মাদিত্য সম্মানে ভূষিত হয়ে সেখানকার জনমানসের হৃদয় মন্দিরে মহামানব হিসেবে সর্বদা পূজিত হন।
**বৌদ্ধ ধর্ম সমাজ সংস্কৃতিকে বলীয়ান বেগবান করার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে নিষ্ঠার মাধ্যমে লালন পালন করে চলেছেন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের ।তাই ধর্মের প্রভূত শ্রীবৃদ্ধি-উন্নতিতে অবদান রাখার জন্য থাইল্যান্ডের ফরা ধর্মাধিরাজ মহামুনির উপস্থিতিতে তার কৃতিত্বের জন্য থাইল্যান্ড সরকার কর্তৃক ১৯৮১ খৃস্টাব্দে শাসন শোভন জ্ঞানভানক উপাধিতে ভূষিত হন ।
**শাসন শোভন জ্ঞানভানক ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের মহোদয় সদ্ধর্ম সমাজে আত্মত্যাগ ও বিনয়ের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা কর্তৃক ২০০১ খৃস্টাব্দে মহামান্য প্রথম সংঘরাজ সারমেধ মহাস্থবিরের দ্বিশত তম জন্মবার্ষিকীতে বুদ্ধশাসনের দুর্লভ উপাধি বিনয়াচার্য অভিধায় অভিষিক্ত হন।
**বৌদ্ধদর্শন প্রচার প্রসারে নিরবচিছন্ন প্রচেষ্টায় অবদান রাখার জন্য মায়ানমার সরকার কর্তৃক তিনি ২০০৭ খৃস্টাব্দে মহাসদ্ধর্মজ্যোতিকাধ্বজ উপাধিতে ভূষিত হন।
** ২০০৭ খৃস্টাব্দে থাইল্যান্ডের মহাচুলারংকর্নরাজা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী(অনারারি পি.এইচ.ডি.) প্রদান করে সম্মানিত করা হয়।
**সদ্ধর্মের প্রচার ও ভিক্ষুসংঘের একতায় অসামান্য অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ কর্তৃক বিশুদ্ধানন্দ স্বর্ণ পদকে ভূষিত হন।
**বুদ্ধ দর্শন সম্পর্কে অপরিমেয় পান্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরুপ ২০১২ খৃস্টাব্দে তিনি বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা কর্তৃক ধর্ম ভান্ডাগারিক উপাধিতে সম্মানিত হন।
**বুদ্ধশাসন রক্ষায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ তিনি বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি কর্তৃক সংঘরাজ সারমেধ শান্তি স্বর্ণ পদকে সম্মানিত হন।
**সমাজসেবায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০ শে ফেব্রæয়ারী ২০২২ ইংরেজী সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মানজনক পুরস্কার একুশে পদক ২০২২ সম্মানে ভূষিত হন।
---ঃমহামান্য ত্রয়োদশ সংঘরাজ পদে অভিষেকঃ---
২০২০ সালের ২১ শে মার্চ মহামান্য দ্বাদশ সংঘরাজ ভদন্ত ধর্মসেন মহাস্থবির মহাপ্রয়ান করার পর সংঘরাজের পদ শূন্য হয়ে গেলে ২০ শে মে ২০২০ খৃস্টাব্দে,রোজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার কারকসভার সর্বসম্মতিক্রমে শাসন শোভন ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাস্থবির মহোদয়কে মহামান্য ত্রয়োদশ সংঘরাজ পদে মনোনীত করা হয়। এরপর ২০২১ সালের ২৫ শে মার্চ,রোজ বৃহস্পতিবার মহামান্য দ্বাদশ সংঘরাজ ভদন্ত ধর্মসেন মহাস্থবিরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পূর্বরাত্রে বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার ৭৩তম বার্ষিক সাধারন অধিবেশনে মহান সংঘের সর্বসম¥তিক্রমে মহামান্য ত্রয়োদশ সংঘরাজ পদে অভিষেক করা হয়।
---ঃসংঘরাজ ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথেরো’র বর্ষাব্রত উদযাপন সূচিঃ---
অবস্থান সময়কাল
মির্জাপুর শান্তিধাম বিহার,হাটহাজারী,চট্টগ্রাম ১ম-৬ষ্ঠ বর্ষাব্রত
রাউজান বিমলানন্দ বিহার,রাউজান,চট্টগ্রাম ৭ম-৮ম বর্ষাব্রত
মুবাইছড়ি,মহালছড়ি,খাগড়াছড়ি ৯ম-১১তম বর্ষাব্রত
মায়ানী দশবল চাকমা রাজবিহার,বোয়ালখালী ১২তম-২৬তম বর্ষাব্রত
কদলপুর সুধর্মানন্দ বিহার,রাউজান,চট্টগ্রাম ২৭তম-৩৭তম
জোবরা সুগত বিহার,হাটহাজারী,চট্টগ্রাম ৩৮তম-৪০তম
মির্জাপুর গৌতমাশ্রম বিহার,হাটহাজারী,চট্টগ্রাম ৪১তম-৪২তম
ঢাকা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার,মেরুল বাড্ডা,ঢাকা ৪৩তম-৪৬তম
বিশ্বশান্তি প্যাগোডা,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়,চট্টগ্রাম ৪৭তম-৪৮তম
বিনাজুরী শ্মশান বিহার,রাউজান,চট্টগ্রাম ৪৯তম-৫৪তম
চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহার,নন্দনকানন,চট্টগ্রাম ৫৫তম-৬১তম
বিনাজুরী শ্মশান বিহার,রাউজান,চট্টগ্রাম ৬২তম
চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহার,নন্দনকানন,চট্টগ্রাম ৬৩তম-বর্তমান