বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১, ২০২২ ||

তথাগত অনলাইন |বুড্ডিস্ট নিউজ পোর্টাল

প্রকাশের সময়:
শুক্রবার ৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, সকাল ৮ টা ২৪ মিনিট

130

অধ্যাপক ড. দীপংকর শ্রীজ্ঞান বড়ুয়া

মধুপূর্ণিমা : ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রকাশের সময়: শুক্রবার ৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, সকাল ৮ টা ২৪ মিনিট

130

অধ্যাপক ড. দীপংকর শ্রীজ্ঞান বড়ুয়া

মধুপূর্ণিমা : ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বৌদ্ধদের উৎসব -পার্বনগুলো মূলত পূর্ণিমাকেন্দ্রিক। বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক মহামতি গৌতম বুদ্ধের জীবনের প্রায় সব কয়টি ঘটনা কোনো না-কোনো পূর্নিমায় সংঘটিত হয়েছিল। এমনকি ভাবে ভাদ্রমাসের পূর্ণিমায় ভগবান বুদ্ধের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি ঘটনা রয়েছে যা বৌদ্ধদের জীবন ওসংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

বুদ্ধরে সময়কালে কৌশাম্বীর ঘোষিতারামে বহুসংখ্যক ভিক্ষু অবস্থান করতেন। ভিক্ষু -সংঘের মধ্যে বিনয়ে পারদর্শী,আর একজন সুত্তে পারদর্শী পণ্ডিত ভিক্ষু ছিলেন। ভিক্ষু সংঘরা উক্ত ভিক্ষু দুইজনের অনুসারী শিষ্য ছিলেন। একসময় বিনয় সংক্রান্ত একটি ছোট বিষয় নিয়ে সুত্রধর এবং বিনয়ধর ভিক্ষুদের মধ্যে মতবিরোধ হয়। উভয় পক্ষ পরস্পরকে দোষারোপ করতে লাগলেন। তাঁদের বিবাদ ক্রমান্বয়ে চরম আকার ধারণ করল। কোনো পক্ষকে থামানো যাচ্ছিল না।স্বয়ং ভগবান বুদ্ধ এসে তাঁদের বিবাদ নিরসনের জন্য চেষ্টা করলেন, কিন্তু কোনো পক্ষই বুদ্ধের কথায়ও কর্ণপাত না করে ভীষণ বিবাদে জড়িয়ে পড়লেন। অনেক চেষ্টার পরও বিবাদ নিরসনে ব্যর্থ হয়ে বুদ্ধ কৌশাম্বী হতে পারিলেয়্য বনেচলে গেলেন। তিনি সেই বনে দশম বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান করেন।

এখানে বুদ্ধ বনের ফলমূল আহরণ করে জীবন নির্বাহ করতেন। কিছুদিন পরে একটি একচারী হস্তী একাকী ঘুরতে ঘুরতে পারিলেয়্য বনে এসে বুদ্ধের দেখা পেল। এই রাজসন্ন্যাসীকে দেখে শ্রদ্ধায় আপ্লুত হয়ে সেও বুদ্ধের সেবায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করল।সে প্রতিদিন সকালে পাথরে পাথর ঘর্ষণ করে পাহাড়ী ঝরণার জল উষ্ণ করে বুদ্ধের স্নানের জল তৈরি করে দিত। আর প্রতিদিন বন থেকেফলমূল যোগাড় করে বুদ্ধকে দান করত।

একটি দলচ্যুত বানর প্রতিদিন হাতী কতৃক বুদ্ধকে সেবা করার দৃশ্য অবলোকন করে বুদ্ধের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা উৎপন্ন হয়। সেও খুঁজতে থাকে বুদ্ধকে কি দিয় কিভাবে পূজো করা যায়। একদিন বনে ঘুরতে গিয়ে পেয়ে যায় একট বিশাল মৌচাক। সে বৃক্ষ থেকে মৌচাকটি নামালো, তারপর মৌচাকের পোকা ময়লা পরিষ্কার করে অত্যন্ত শ্রদ্ধা সহকারে কুদ্ধের হাতে অর্পন করলো। বুদ্ধ পরম তৃপ্তি সহকারে মধু পান করলেন। তা দেখে বানর আনন্দে আত্মহারা। সে আনন্দে লাফাতে লাফাতে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু বরণ করল, মৃত্যুর পর মধুদানের ফলে তাবতিংস স্বর্গে উৎপন্ন হলো। দানের যে কী অপার মহিমা! বানর যে দান করেছিল সেই দিনটি ছিল ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথি। এই পূর্ণিমা মধুপূর্ণিমা নামে অভিহিত। এদিনে বৌদ্ধ আবালবৃদ্ধবনিতা নতুন কাপড়পরিধান করে উত্তম খাদ্য ভোজ্য এবং ফল মূল পূজোপকরণ নিয়ে বিহারে গিয়ে বুদ্ধ পূজা করেন,বন্দনাদি করেন। উপোসথ শীল গ্রহণ করেন। দিনব্যাপী ধর্মীয় কর্মাদি সম্পন্ন করেন। ভিক্ষুসংঘকে খাদ্য ভোজ্য মধু এবং অন্যান্য দানীয় সামগ্রী দান করেন। এছাড়াও বিহারে ধর্মালোচনা হয়।
এদিন বৌদ্ধদের ত্যাগের আদর্শ শিক্ষা দেয়, মানবিকতা শিক্ষা দেয়।

কৌশাম্বীবাসী ভিক্ষুর এই দ্বন্দ্ব সকল ভিক্ষুসংঘের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো। এবিষয় সাধারণ জনগণ জানতে পেরে ভিক্ষু সংঘের ওপর কোপিত হয়ে ওঠলো। তারা তাদের চতুর্প্রত্যয় প্রদান বন্ধ করে দিল। অবশেষে ভিক্ষরা তাদের ভুল উপলব্ধি করতে পেরে তাঁরা পারিলেয়্য বনে গিয়ে বুদ্ধের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে লোকালয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জনালেন।বুদ্ধ তাঁদের উপদেশ দিলেন,

সুখো বুদ্ধানুপ্পাদো সুখা সদ্ধম্মদেসনা,
সুখা সংঘস্স সামগ্গী সমাগ্গানং তপো সুখো।

সুখ এবং শান্তি কিসে হয়? বুদ্ধগণের উৎপত্তি সুখকর,কারণ বুদ্ধের আবির্ভাব হলে তিনি মানবের মুক্তির পথ প্রদর্শন করেন। তিনি প্রণিজগতের কল্যাণে ধর্ম প্রচার করেন। বুদ্ধগণ সদ্ধর্ম প্রচার করেন, এতে দেবমানবের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ সাধিত হবে। একত্রেবসবাস করা সুখকর। মিলনে শান্তি, বিচ্ছেদে দুঃখ। আর ঐক্যবদ্ধভাবে যে কাজ সম্পাদিত হয় তাতে অনেক সুখ। বুদ্ধ যে কোনো ভেদমূলক কর্ম থেকে বিরত থাকার কথা বলেছেন।
ঐক্য বদ্ধ সামাজিক জীবনে যত আনন্দ ও সুখ অন্য কোনো কিছুতে নেই। বুূ্দ্ধ বিভেদ নয়, ঐক্য বদ্ধ জীবন যাপন করার জন্য বলেছেন।

মধুপূর্ণিমার আদর্শে আমাদের জীবন পূর্ণতা লাভ করুক।  এই মধুপূর্ণিমা উপলক্ষে সকলকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা এবং কামনাও প্রার্থনা করি সকলের জীবন মধুময় হয়ে ওঠুক।
ভবতু সব্ব মঙ্গলম্।