মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২ ||

তথাগত অনলাইন |বুড্ডিস্ট নিউজ পোর্টাল

প্রকাশের সময়:
মঙ্গলবার ২৯জুন২০২২, 22.53

117

প্রতিবেদন

পানছড়ি শান্তিপুর অরণ্য কুটির: শান্তির সুশীতল হাতছানি

প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার ২৯জুন২০২২, 22.53

117

প্রতিবেদন

পানছড়ি শান্তিপুর অরণ্য কুটির: শান্তির সুশীতল হাতছানি

পানছড়ি শান্তিপুর অরণ্য কুটির। উপজেলা সদর হতে ৫ কিঃ মিঃ দক্ষিণে শান্তিপুর গ্রামের সন্নিকটে টিলার উপর গড়ে উঠেছে এই অরণ্য কুটির। ঘন সবুজের ভিতর দিয়ে বিলি কেটে চলতে চলতে হঠাৎ খোলা প্রান্তরে এসে চোখ একেবারে আটকে যায়। একি বাংলাদেশ! আহ্! কী অপূর্ব দৃশ্য! সবুজে সবুজময় ধানক্ষেত। যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজের গালিচা। এই সবুজ খোলা প্রান্তরের ঠিক পিছনেই উঁচু-নীচু পাহাড়ের মায়াবী হাতছানি।

এই মায়াবী পাহাড়ের চূড়ায় প্রকৃতির অবারিত ঘন সবুজ বনানীর ছায়া সুনিবির মমতায় ঘেরা অপূর্ব সৌন্দর্যের লীলাভূমি, ধ্যান-সাধনার পীঠস্থান ও পূর্ণময় তীর্থক্ষেত্র হিসেবে ১৯৯৯ সালের ২৯ মার্চ তারিখে প্রতিষ্ঠা করা হয় পানছড়ি শান্তিপুর অরণ্য কুটির। বিশাল এলাকা জুড়ে অরণ্য পরিবেষ্টিত বলেই এর নাম করণ করা হয়েছে অরণ্য কুটির। শান্তিপুর অরণ্য কুটিরের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ শ্রীমৎ শাসন রক্ষিত মহাস্থবিরের অদম্য সাহস, অক্লান্ত পরিশ্রম, সাধনা ও ত্যাগের ফসল হচ্ছে এই পবিত্র তীর্থভূমি। নিবির বনছায়ায় শান্ত, মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে ধ্যান সাধনার জন্যে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এই অরণ্য কুটির ব্যবহার করেন। শুধু রূপ-মাধুর্যে নয়, শান্তিপুর অরণ্য কুটির সমগ্র বাংলাদেশের বৌদ্ধ তীর্থভূমির মধ্যে একটি অনন্য তীর্থস্থান।

শান্তিপুর অরণ্য কুটিরের প্রধান আকর্ষণ হলো বৃহদাকার বুদ্ধমূর্তি। সাড়ে ছয় ফুট উঁচু আসনের উপর বসা প্রায় ৫০ ফুট উঁচু এই মূর্তি বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার সর্ব বৃহৎ বুদ্ধমূর্তি। কুটিরের অধ্যক্ষ মহোদয়ের অনুমোদনক্রমে উপাধ্যাক্ষ শ্রীমৎ করুণা বর্দ্ধন ভান্তের উদ্যোগে এলাকার বিভিন্ন স¤প্রদায়ের সার্বজনীন নর-নারী ও দায়ক-দায়িকাগণের শ্রদ্ধাদান এবং কঠোর কায়িক ও মানসিক শ্রম এবং মায়ানমারের বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ শিল্পী পুঁঞা মিস্ত্রীর নিপুন হাতের ছোঁয়ায় ২০০৪ সালের ২৭ আগষ্ট হতে শুরু হয় এই বুদ্ধমূর্তি নির্মাণের চুড়ান্ত কাজ। হাজার হাজার নর-নারী মৈত্রীময় ও উৎফুল­চিত্তে এই নির্মাণ কাজে অংশ গ্রহণ করেন। ২০০৪ সালের ৪ নভেম্বর তারিখে সম্পন্ন হয় এর নির্মাণ কাজ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক অনুদানে নির্মিত হয়েছে ৬ষ্ঠ তলা সমপরিমান উঁচু এই মন্দিরের ছাদ।

শুধু বৃহদাকার বুদ্ধমূর্তিই নয়, এই মন্দির প্রাঙ্গণে ঠাঁই পেয়েছে মার বিজয়ী অরহত পূজনীয় শ্রীমৎ উপগুপ্ত মহাস্থবিরের মূর্তিও। ফণা তোলা বিশালাকৃতির নাগ যে মূর্তিটিকে তার বক্ষে ধারণ করে আগলে রেখেছে এটি হচ্ছে মার বিজয়ী অরহত পূজনীয় শ্রীমৎ উপগুপ্ত মহাস্থবিরের মূর্তি। পানছড়ি শান্তিপুর অরণ্য কুটিরের মূল মন্দিরে প্রবেশ পথে হাতের বা দিকে এর অবস্থান। বুদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মহামতি গৌতম বুদ্ধের প্রিয় এই শিষ্য এখনো সাগরের তলদেশে ধ্যানরত অবস্থায় বিরাজ করছেন।

উপগুপ্তের মন্দিরের ঠিক বিপরীত দিকেই রয়েছে সিবলী বুদ্ধ মন্দির। লাভীশ্রেষ্ঠ সিবলী মহাস্থবিরের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এখানে। পানছড়ির লতিবান মুখ ইউনিয়নের কৃপাচরণ পাড়া নিবাসী দানবীর শুভাশীষ চাকমার অর্থায়নে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এই সিবলী বুদ্ধ মন্দির।

মূল মন্দির থেকে বের হয়ে হেরিংবোন রাস্তা ধরে মৈত্রী ভবনের দিকে যেতেই হাতের ডান পাশে রয়েছে একটি ছোট্ট কুটির। অরণ্য কুটিরের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ শাসন রক্ষিত মহাস্থবিরের গুরু রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারের অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির ওরফে বনভান্তের ধ্যানরত মূর্তিসহ আরো দু’জন মহাপুরুষের মূর্তি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে এই কুটিরে।

একদিকে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং অন্যদিকে কুটিরের আয়ের উৎস সৃষ্টির লক্ষ্যে মন্দির চত্বরের খালি জায়গায় লাগানো হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ৩৫ হাজার ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ। এছাড়া প্রাকৃতিকভাবেও জন্ম নিয়েছে অসংখ্য গাছ। কুটিরের পরিবেশকে আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর করতে বিভিন্ন স্থানে লাগানো হয়েছে অসংখ্য দেশী-বিদেশী ফুল ও শোভাবর্ধণকারী গাছ।

মহামতি গৌতম বুদ্ধের জীবনের কিছু উলে­খযোগ্য ঘটনাকে উপজীব্য করে এখানে নির্মাণ করা হয়েছে বেশ কিছু ভাস্কর্য। যার মধ্যে সুজাতা কর্তৃক মহামতি গৌতম বুদ্ধকে পায়াসান্ন দান এবং বানর কর্তৃক ভগবান বুদ্ধকে মধুদানের ঘটনা অন্যতম।

শান্তিপুর অরন্য কুটিরের অন্যান্য উলে­খযোগ্য স্থাপনাগুলোর মধ্যে ১০০ হাত দৈর্ঘ্যরে ভিক্ষুশালা, ৬০ হাত দৈর্ঘ্যরে দেশনাঘর এবং ৮০ হাত দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট ভোজনশালা অন্যতম। এখানে ২৫টিরও বেশি পর্ণ কুটির রয়েছে। উপ-কুটিরও রয়েছে বেশ কিছু। প্রত্যেকটি কুটির ও উপ-কুটিরে একজন করে ভিক্ষু ও শ্রামণ ভাবনা বা ধ্যানমগ্ন থাকেন।

এটি একটি হিংসা-বিদ্বেষহীন মৈত্রীপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত এই প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন বহু সংখ্যক পূর্ণ্যার্থী ও পর্যটকের আগমন ঘটে এখানে। বর্তমানে এই উপাসনালয়টি একদিকে যেমন তীর্থস্থান অন্যদিকে তেমনি দর্শনীয় স্থান হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। প্রতি বছর বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব কঠিন চীবর দান মহাসমারোহে উদ্যাপন করা হয় এখানে এবং উক্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে।