মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২ ||

তথাগত অনলাইন |বুড্ডিস্ট নিউজ পোর্টাল

প্রকাশের সময়:
সোমবার , ১৩জুন ২০২২ ০০.০৩

108

নিপুন বড়ুয়া

দু’টি পুণ্যময় তিথিতে মহীয়ান জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা

প্রকাশের সময়: সোমবার , ১৩জুন ২০২২ ০০.০৩

108

নিপুন বড়ুয়া

দু’টি পুণ্যময় তিথিতে মহীয়ান জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা

অপরাপর পূর্ণিমার মতন বৌদ্ধ ধর্মানুষ্ঠানের ক্ষেত্রে জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমার মাহাত্ম্য সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ পূর্ণিমায় দু’টি বিশেষ গুরুত্ববহ ঘটনার সংশ্লিষ্টতা ত্রিপিটক শাস্ত্রে দেখা যায়। প্রথমটি হলো এ পূর্ণিমায় ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক শ্রাবস্তীতে প্রথম ধর্মপ্রচার শুরু হয়। উল্লেখ্য, এই শ্রাবস্তীতেই ভগবান তাঁর জীবনের ২৫ টি বর্ষাবাস অতিবাহিত করেন (১৪তম বর্ষাবাস, এবং ২১ হতে ৪৪ তম বর্ষাবাস পুনঃ শ্রাবস্তী (তন্মধ্যে মহাউপাসিকা বিশাখা কর্তৃক দানকৃত পূর্বারামে ৬টি বর্ষাবাস এবং অবশিষ্ট ১৯টি বর্ষাবাস অনাথপিণ্ডিক শ্রেষ্ঠীর দানকৃত জেতবন বিহারে অবস্থান করেন) আর দ্বিতীয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো এ তিথিতে মহাসম্রাট অশোক নন্দন স্থবির মহেন্দ্র শ্রীলঙ্কায় ধর্ম প্রচার করেন।

শ্রাবস্তীতে বুদ্ধের প্রথম ধর্মপ্রচার

তদানীন্তন ভারতের ষোলটি মহাজনপদের অন্যতম কোশল রাজ্যের রাজধানী শ্রাবস্তী ছিল তৎকালীন সময়ের এক অতি সু-সমৃদ্ধশালী নগরী। অন্যান্য মহাজনপদগুলো হলো- কাশী, অঙ্গ, মগধ, বজ্জি, মল্ল, চেদি, বৎস, কুরু, পাঞ্চাল, মৎস, সুরসেনা, অস্মক, অবন্তী, গান্ধার এবং কম্বোজ। শিল্পবিদ্যা, যুদ্ধকৌশল সর্বদিক দিয়ে কোশল রাজ্যের রাজধানী শ্রাবস্তী ভারতবর্ষের অপরাপর নগরীর চাইতে কম ছিল না। হরিবংশ পুরাণের মতে রাজা যবনাশ্বের পুত্র শ্রাবস্তই এ নগরের প্রতিষ্ঠাতা এবং তাঁর নামানুসারে এ নগরের নামকরণ করা হয় শ্রাবস্তী। রাজ্য কোশলের নগর বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী শ্রাবস্তী ও সমৃদ্ধির চরম শিখরে পৌঁছে। এই শ্রাবস্তীতে অনেক শ্রেষ্ঠীর বাস। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিল শ্রেষ্ঠী সুদত্ত। এই ধনাধিপতির অন্য নাম অনাথপি-িক। তিনি অনাথদের অন্ন দাতা ছিলেন বলেই তাঁর এবংবিধ উপাধি। তিনি ছিলেন পরদুঃখকাতর, পরোপকারী এবং ধর্মভীরু। এই অনাথপি-িকেরই সকাতর আবেদনে বুদ্ধ ভগবান তাঁর নবলব্ধ দুঃখতিমির বিনাশী মুক্তিপ্রদায়ী অমৃতোপম সদ্ধর্ম শ্রাবস্তীতে প্রচারের নিমিত্তে আগমন করেন।

অনাথের অন্নদাতা নামে খ্যাত শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডিক গেছেন স্বীয় ভগ্নিপতি ও শ্যালক রাজগৃহ শ্রেষ্ঠীর বাড়িতে; গিয়ে যা দেখলেন তাতে তিনি হতভম্ব হয়ে পড়লেন। অন্য সময় তিনি আসলে তাঁর আদর আপ্যায়নের জন্য সকলেই শশব্যস্ত হয়ে পড়তেন। কিন্তু এবারের আসায় তাঁর প্রতিসৎকারে শশব্যস্ত হওয়া তো দূরের কথা তাঁর প্রতি কেউ তেমন ভ্রুক্ষেপও করছে না। কিন্তু সবাই মহাব্যস্ত চৌদিকে হাঁক-ডাক চলছে, যেন প্রত্যেকেই কোন একটা বিশাল নিমন্ত্রণর জন্য ব্যস্ত। কিছুটা শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে রাজগৃহ শ্রেষ্ঠী যখন অনাথপিণ্ডিকের কাছে এসে বসলেন তখন কুশল জিজ্ঞাসান্তে ধনকুবের অনাথপিণ্ডিক রাজগৃহ শ্রেষ্ঠীকে প্রশ্ন রাখলেন “শ্রেষ্ঠীবর, আপনার বাড়িতে কি রাজা বিম্বিসার আমন্ত্রিত, নাকি কোন যজ্ঞায়োজন হয়েছে, সবাই এত ব্যস্ত কেন? রাজগৃহ শ্রেষ্ঠী বললেন, “না শেঠবর, সেরকম কিছু নয়, এসব আয়োজন ও ব্যস্ততার কারণ হলো আগামীকালের জন্য বুদ্ধ প্রমুখ মহান ভিক্ষুসঙ্ঘ আমার বাড়িতে নিমন্ত্রিত। বুদ্ধ প্রমুখ মহাসঙ্ঘের জন্যে ৫০০ টি কুটীর নির্মাণ করে দান করার এবং পূজা-সম্মান-সৎকার জন্য এতসব আয়োজন। এবং তা নিয়ে ব্যস্ততার দরুণ আমি আপনাকে অভ্যর্থনা করতে পারিনি।” ‘বুদ্ধ’ শব্দটি শোনা মাত্রই অনাথপিণ্ডিকের সর্বাঙ্গ যেন কি এক পুলকে উদ্বেলিত হয়ে উঠল। ‘বুদ্ধ’ শব্দটি যেন তাঁর কানে গিয়ে প্রাণে বাজল। তিনি উতলা হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “শ্রেষ্ঠীবর, আপনি ‘বুদ্ধ’ বলছেন?” “হ্যাঁ, আমি ‘বুদ্ধ’ বলেছি।” শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডিক "বুদ্ধ" শব্দ শুনেই ভাবাবেগে বলে উঠলেন, বুদ্ধ! বুদ্ধ! বুদ্ধ! অহো! কি অমিয় নির্ঝরিনী শব্দ, বলতে বলতে তিনি অনির্বচনীয় ভাবে বিভোর হয়ে পড়লেন। তাঁর সমস্ত সত্তা বুদ্ধ দর্শনের প্রবল আকাঙ্ক্ষায় আনচান করে উঠল।

তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, গোধূলীর আলো-অন্ধকার মিলিয়ে সর্বত্র যামিনীর চাদরে ছেয়ে যাবার অবস্থা। শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডিক আকুল অন্তরে রাজগৃহ শ্রেষ্ঠীকে বললেন, “শ্রেষ্ঠীবর, এখন কি বুদ্ধ দর্শন করা যাবে? আমি বুদ্ধ দর্শন করতে চাই।" রাজগৃহ শ্রেষ্ঠী উত্তর দিলেন, “না শেঠবর, এখন তো সন্ধ্যা সমাসন্ন। রাত ঘনিয়ে এসেছে। এখন বুদ্ধ দর্শনের উপযুক্ত সময় নয়। এখন তিনি ধ্যানমগ্ন হয়তো। তদুপরি বুদ্ধের আবাসস্থল হলো লোকালয় হতে দূরে, বনমধ্যে। এতরাত্রে বনভূমিতে যাওয়াও অনিরাপদ, বিশেষত আপনার মতোন সম্ভ্রান্তজনের জন্য। আপনি বরং কাল সকালেই তাঁকে দর্শনার্থে গমন করুন।” রাজগৃহ শ্রেষ্ঠীর কথায় অনাথপিণ্ডিক তখনকার মতোন নিরস্ত হলেন বটে, কিন্তু বুদ্ধ দর্শনের অত্যুগ্র বাসনা তাঁর সমস্ত সত্তা জুড়ে আকুল হয়েই রইলো! তিনি ব্যাকুলভাবে প্রতীক্ষা করতে লাগলেন কখন সকাল হবে সেই প্রত্যাশায়। সারারাত বুদ্ধ দর্শনের সুতীব্র ব্যাকুলতায় তাঁর ঘুম এলো না। নির্ঘুমের রাত্রি জাগরণ নাকি দীর্ঘ হয়। শ্রাবস্তীর ধনকুবের অনাথপিণ্ডিকেরও সেই দশা, ঘুম আসে না, শুধুই ‘বুদ্ধ’ শব্দের প্রতিধ্বনি হয়ে চলেছে তাঁর হৃদয়ের অলিগলিতে। রাতের অন্তিম প্রহরে শরীর একটু ক্লান্ত হলে ঘুম এলো। সেই ঘুমেই তিনি স্বপ্নাবিষ্ট হলেন। স্বপ্নে তিনি দেখলেন, অসীম মহাশূন্যে এক বিরাট জ্যোতিপুঞ্জ ফুটে উঠেছে। চরাচর সেই জ্যোতিপুঞ্জের স্নিগ্ধ আলোয় প্লাবিত হয়ে ঝলমল করছে। সেই জ্যোতিপুঞ্জের মধ্য হতে এক জ্যোতির্ময় পুরুষ তাঁর দিকে এগিয়ে এসে তাঁকে সম্বোধন করে শান্ত-কোমল স্বরে যেন বলছে, “এসো, সুদত্ত!’ হঠাৎ তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। পূর্ব দিগন্তে তখন ঊষার রক্তিম রাগ দিগন্তপাড়কে বর্ণিল করে তুলেছে। কাছে পিঠে আবছা অন্ধকার, দু’একটি পাখি কূজন করছে, গৃহপালিত পশু-পাখি জেগে উঠি উঠি করছে। সেই পরিবেশে ‘বুদ্ধ’ শব্দের মোহনীয় টানে আকুল শ্রেষ্ঠী সুদত্ত ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়লেন ‘সীতবন’ নামীয় বনভূমির পানে, বুদ্ধ দর্শনের জন্যে, যেখানে অবস্থান করছেন তথাগত করুণানিধান শাক্যসিংহ সিদ্ধার্থ গৌতম। দুরুদুরু বক্ষে ভোরের আবছা অন্ধকার ভেদ করে শ্রেষ্ঠী সীতবনে পৌঁছলেন। চারিদিক বনাচ্ছন্ন পাহাড় তার অপরূপ শ্যামলিমাময় নিসর্গে সেই স্থানকে করে রেখেছে আকর্ষণীয়। সত্যিই, বিরাগীজনের জন্য যথোপযুক্ত পরিবেশ সেথায়। পাহাড়ের পাদদেশ বেয়ে মন্দস্রোতে গড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ের কান্নারূপ ঝরণার জলবেগ।

শ্রেষ্ঠী অনাথাপিণ্ডিক দাঁড়ালেন ঝরণার কোল ঘেঁষে। তাঁর স্থিত স্থানের অদূরে প্রজ্ঞা-করুণার মূর্তপ্রতীক ধর্মস্বামী সর্বদর্শী তথাগত শিশিরাদ্র উন্মুক্ত অম্বর তলে তখন পায়চারি করছেন। বুদ্ধ পায়চারি করার সময় সুদত্তকে দেখলেন এবং ডাকলেন “এসো সুদত্ত” যেমনটি ডেকেছিলেন স্বপ্নে দৃষ্ট সেই জ্যোতির্ময় মহামানব। বুদ্ধের অমিয় মধুর আহ্বানে ইতঃস্তত করা সুদত্তের আকুল দৃষ্টি পড়ল বুদ্ধের উপর। তথাগতের জ্যোতির্ময় দেহবল্লরী, পবিত্র বদনমণ্ডলের অনাবিল সৌম্য প্রশান্তি, করুণাস্নিগ্ধ চাহনি শ্রেষ্ঠীকে অভিভূত করে ফেলল। তিনি তন্ময় হয়ে চিন্তা করলেন, ‘সুদত্ত তো আমার পিতৃদত্ত নাম; লোকে আমাকে অনাথপিণ্ডিক নামেই জানে এবং চিনে, নিশ্চয়ই বুদ্ধ সর্বজ্ঞ, না হলে তিনি কীভাবে আমার পিতৃদত্ত সকলের অজানা নাম ‘সুদত্ত’ বলেই সম্বোধন করলেন! তাঁর চিত্ত লোক আরও প্রগাঢ় ভাবে প্রসন্ন হয়ে ওঠল তথাগতের প্রতি। তখন ছিল শীতকাল, শীতের প্রত্যুষে পাহাড়ের হিমেল বাতাসে অনাথপি-িকের রক্ত যেন হিম হয়ে আসছে। বুদ্ধ একখানি মাত্র উত্তরীয়ে অঙ্গ আবৃত করে আছেন তা দেখে তিনি ভাববিহ্বল হয়ে তথাগতের চরণে লুটিয়ে পড়লেন এবং ভগবানকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভন্তে, এ কনকনে ঠাণ্ডায় আপনার সুনিদ্রা হয়েছে তো?’

তদুত্তরে বুদ্ধ বললেন

-যো ন লিম্পতি কামেসু সীতিভূতো নিরূপধি।

’অনুবাদ : কামনার বহ্নি জ্বালা নিভিয়াছে যাঁর অন্তরেতে অনাবিল শান্তিপারাবার,তরঙ্গিত নিরন্তর ব্রাহ্মণ সে জন করেন সকল কালে সুখেতে শয়ন।

অতঃপর বুদ্ধ অনাথপিণ্ডিকের চিত্তানুযায়ী দান-শীলের উপকারিতা ও কামভোগের অপকারিতা বিষয়ে উপদেশ দিলেন। তন্ময় হয়ে বুদ্ধের ধর্মোপদেশ শুনতে শুনতে শ্রেষ্ঠীর উৎপন্ন হলো বিরজঃ, বীতমল ধর্মচক্ষু। তাঁর সমুদয় সংশয় নিঃশেষিত হয়ে গেল। বুদ্ধের চরণে প্রণত হয়ে বুদ্ধের উপাসকত্ব গ্রহণ করলেন এবং প্রার্থনা জানালেন তৎপর দিবসে শ্রেষ্ঠীর নিমন্ত্রণ গ্রহণের জন্য। তথাগত মৌন সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। অনাথপিণ্ডিক পরদিন তথাগতকে স্ব-হস্তে আহার্য দান করে নিবেদন করলেন অন্তরের এক গোপন বাসনা। বললেন, ‘ভগবান, আপনাকে শ্রাবস্তীতে বর্ষা যাপনের জন্য প্রার্থনা জানাচ্ছি। করুণাধিরাজ এবারেও মৌন সম্মতি প্রদান করলেন। ধর্মচক্ষুষ্মান অনাথপি-িক শ্রেষ্ঠী শাস্তার সম্মতি পেয়ে অতি হর্ষোৎফুল্ল হৃদয়ে শ্রাবস্তী অভিমুখে যাত্রা করলেন। যাত্রা পথে যার সঙ্গেই সাক্ষাৎ হচ্ছে তাকেই বলছেন, ‘জগতে বুদ্ধ উৎপন্ন হয়েছেন, আমি তাঁর অমিয় ধর্মসুধা পান করেছি, তাঁকে আমি শ্রাবস্তী আসার জন্য ফাং (নিমন্ত্রণ) করেছি” ইত্যাদি পুণ্য চেতনা প্রসূত বাক্য। অনাথনাথ শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডিকের মুখে বুদ্ধের কথা শুনে অনেকেই বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধান্বিত হয়ে পড়লেন। পূর্ব হতে যারা বুদ্ধকে জানতেন তারা বুদ্ধের আগমন সংবাদে অতিশয় হরষিত অন্তর হলেন। শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডিক যেন অন্য বাক্যালাপ করতে ভুলেই গেলেন। সর্বদা সর্বত্রই বুদ্ধ দর্শনের কথা, বুদ্ধের শ্রাবস্তী আগমনের কথা। শ্রেষ্ঠী ক্রমে শ্রাবস্তী পৌঁছলেন এবং শ্রাবস্তীর চৌদিকে বুদ্ধের জন্য বিহার নির্মাণ মানসে নগর হতে নাতিদূরে, জনকোলাহল মুক্ত, দর্শনার্থীর আগমন সুখকর, মুক্ত বায়ু সম্পন্ন ও বিবেক বাসের উপযোগী মনোরম স্থান সন্ধান করতে লাগলেন। শেষে দেখতে পেলেন রাজকুমার জেতের প্রমোদ উদ্যান যেটি ছিল অনাথপিণ্ডিকের কাঙ্ক্ষিত ও সন্ধিত পরিবেশ এবং গুণ সম্পন্ন; হরিদ্বর্ণ কুঞ্জবন ও স্বচ্ছ জলাশয় শোভিত। শ্রেষ্ঠী অচিরেই যুবরাজ জেত সন্নিধানে গিয়ে তাঁকে বুদ্ধের সঙ্গে শ্রেষ্ঠীর দর্শনের কথা, বুদ্ধকে শ্রাবস্তী আসার জন্য প্রার্থনার কথা ইত্যাদি বললেন। অতঃপর বললেন, ‘কুমার, তথাগত বুদ্ধের বিহার নির্মাণের জন্য আমি আপনার উদ্যানটি ক্রয় করতে চাই। আপনাকে উদ্যানটি আমার কাছে বিক্রয় করতে হবে।’ উদ্যানটি ছিল কুমার জেতের অতি প্রিয় এবং তাই কুমার জেত তা বিক্রয় করতে অসম্মতি জানালেন। পরে শ্রেষ্ঠীর বহু অনুরোধ-উপরোধের পর রাজি হলো বটে কিন্তু অসম্ভব ধরণের মূল্য হেঁকে বসলেন। যুবরাজ জেত শ্রেষ্ঠীকে বললেন, ‘শ্রেষ্ঠীবর, সমস্ত উদ্যানটি যদি আপনি স্বর্ণমুদ্রা দ্বারা আবৃত করে দিতে পারেন তবেই আমি আপনার নিকট উদ্যানটি বিক্রয় করতে রাজি আছি; নচেৎ নয়। শ্রেষ্ঠী আর কোনো বাক্যব্যয় না করে অত্যুৎফুল্ল চিত্তে কুমারের কথায় রাজি হয়ে গেলেন। রাজকুমার কিন্তু ভুলেও ভাবেননি যে, তার এই অসম্ভব এবং অনৌচিত্যমূলক প্রস্তাবে শ্রেষ্ঠী রাজি হবেন। তিনি বিস্মিত হয়ে গেলেন, এও কি সম্ভব! সামান্য একটা উদ্যানের জন্য! এদিকে কুমারের সম্মতি পেয়ে শ্রেষ্ঠী স্বীয় সঞ্চিত রাশি রাশি স্বর্ণমুদ্রা এনে উদ্যানটি আবৃত করতে লাগলেন। এতদৃশ্য অবলোকনে সেখানে অনেক লোকের সমাগম হলো। সত্যিই বুদ্ধের অত্যাশ্চর্য মহিমা, বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধান্বিত জনের শ্রদ্ধা অমূল্য। আর তাইতো শ্রেষ্ঠী অনাথপি-িক পেরেছিলেন বহুজনের অসাধ্য এমন ব্যয় বহুল কাজটি করতে। যার ফলশ্রুতিতে আজও লোকে সকৃতজ্ঞ ও গুণগ্রাহী হয়ে স্মরণ করে অনাথের অন্নদাতা শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডিকের কথা। বৌদ্ধ সাহিত্যে অনেক সুত্রে উদ্ধৃত হয় ‘অনাথপিণ্ডকস্স আরামে’ শব্দ।শ্রেষ্ঠীর ত্যাগেচ্ছা, উদারতা, দানপ্রিয়তা, বুদ্ধের প্রতি প্রসন্নতার মহিমা দর্শনে কুমার জেত অতি অবাক হয়ে গেলেন। তাঁর মন গলে গেল। তিনি দেখলেন আর কিছু স্থান বাকি আছে স্বর্ণমুদ্রা দ্বারা আবৃত করার। তাই দেখে কুমার জেত শ্রেষ্ঠীকে বললেন, ‘শ্রেষ্ঠীবর, আপনাকে অনাবৃত স্থানটি আর আবৃত করতে হবে না, আমি অনাবৃত স্থানটি বুদ্ধের বিহার নির্মাণের জন্য দান করলাম। বুদ্ধের প্রতি জেতের এ আকস্মিক প্রসন্নতায় শ্রেষ্ঠীবর বিমুগ্ধ হয়ে গেলেন এবং জেতের কথামতো অনাবৃত স্থানটি আর আবৃত না করে বুদ্ধের উদ্দেশ্যে জেতের দান গ্রহণ করলেন। উল্লেখ্য, শ্রেষ্ঠী যে স্বর্ণমুদ্রা বিছিয়েছিলেন সেগুলোর সংখ্যা হলো আঠারো কোটি। তিনি আরও আঠারো কোটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে নির্মাণ করলেন সুরম্য মনোরম সুন্দর এক বিহার। মধ্যস্থলে বুদ্ধের বাসগৃহ ‘গন্ধকুঠি'র চতুর্পাশে নির্মিত হলো পরিবেণ, কক্ষ, সভাগৃহ, অগ্নিশালা, ভাণ্ডার, পায়খানা-প্রগ্রাবগৃহ, চঙ্ক্রমণশালা, কূপ, কূপশালা, স্নানাগার, স্নানাগারশালা, পুকুর, মণ্ডপ ইত্যাদি। কুমার জেতের নামানুসারে বিহারের নাম রাখা হলো "জেতবন আরাম"। তৎপর বার্তাবাহক পাঠানো হলো ভগবানের নিকট। বার্তাবাহক শ্রেষ্ঠীর প্রণতি জানিয়ে সবিস্তার নিবেদন করলেন তথাগতের নিকট। তথাগত রাজগৃহের সীতবন হতে সশিষ্যে অগ্রসর হলেন শ্রাবস্তী অভিমুখে। রাজগৃহ হতে শ্রাবস্তীর পয়ঁতাল্লিশ যোজন দূরত্ব পেরিয়ে তথাগত ধর্মস্বামী নিকটবর্তী হলেন শ্রাবস্তী নগরের। প্রথমে নব বস্ত্রালংকৃত অপ্রাপ্তবয়স্কা বালিকাগণ, তারপর বালকগণ, এভাবে ক্রমান্বয়ে রমণীগণ ও সর্বশেষে পুরুষগণকে নিয়ে বিরাট শোভাযাত্রা সহকারে শ্রেষ্ঠী আগু বাড়িয়ে নিলেন শাস্তা ভগবানকে। তথাগত সশিষ্য ও শ্রেষ্ঠ জনসংঘ সমেত পৌঁছলেন বিহার জেতবনে। শ্রেষ্ঠী সুবর্ণ পাত্র হতে তথাগতের শ্রী হস্তে জল ঢেলে সর্বমোট ছত্রিশ কোটি স্বর্ণমুদ্রা মূল্যের বিহার বিনম্র শ্রদ্ধায় ও অপার ভক্তিতে সমর্পণ করলেন বুদ্ধ প্রমুখ আগতনাগত মহান ভিক্ষু সঙ্ঘের উদ্দেশ্যে। এহেন মঙ্গল প্রসবিনী কর্মকে প্রশংসা করতে সাধু রবে প্রকম্পিত হলো সমগ্র অঞ্চল। গৈরিক বসনধারী অনাগারিক মহান ভিক্ষু সংঘের সমাগমে নানাবিধ কুসুম নিচয় ও বিবিধ অর্ঘ্যোপকরণের সমাহারে মনোরম রূপ ধারণ করল নব বিহার। এ বিহারে তথাগত তাঁর জীবনের ১৯ টি বর্ষা যাপন করেন এবং অনেক ধর্মোপদেশ দান করেন যা অগুনতি দেব মনুষ্যের মুক্তির পাথেয় হয়। আর যেদিন এ বিহার উৎসর্গিত হয় সেদিন ছিল জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা এবং এদিন হতেই শ্রাবস্তীতে শুরু হয়েছিল তথাগতের ধর্মাভিযান। বুদ্ধ দ্বিতীয় বর্ষা হতে চতুর্থ বর্ষাবাস পর্যন্ত রাজগৃহে অধিষ্ঠান করেছিলেন। এবং এর মধ্যে বহু বিমুক্ত ভিক্ষু সংঘের উদ্ভবে শাসনের বিজয়পতাকা সগর্বে উড়তে আরম্ভ করেছে। তবে ভিক্ষুগণের প্রতি তথাগতের নির্দেশ ছিল যে তাঁরা বৃক্ষতলায় থাকবে। শ্মশান হতে সংগৃহীত বস্ত্র পরিধান করবে। ভিক্ষান্নে জীবিকা নির্বাহ করবে। শারীরিক অসুখের সময় গো-মূত্রকে ভৈষজ্য হিসেবে ব্যবহার করবে। বুদ্ধের প্রতি অতি শ্রদ্ধায় শাসনের স্থিতি ও শ্রীবৃদ্ধির জন্য ভিক্ষু সংঘ এমনতরো সুকঠিন নিয়ম মেনে আত্মানুসন্ধান করে চলছে। এভাবে ক্রমে ভিক্ষুর সংখ্যা দাঁড়াল আড়াই হাজার। এ সমস্ত ভিক্ষু সংঘের অনেকেই এসেছে সম্ভ্রান্তপরিবার হতে। তাদের কথা ভেবে রাজগৃহ শ্রেষ্ঠী একদা বুদ্ধের নিকট গিয়ে বললেন, ‘ভন্তে ভগবান, এসব সম্ভ্রান্ত পরিবারে সন্তান একমাত্র জীবনের আধ্যাত্মিক প্রগতির জন্য বিরাগময় ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন। তাঁদের নিরাপত্তার জন্য আমি বিহার নির্মাণের মনস্থ করেছি। আপনি তা অনুমোদন দিন। ভগবান শ্রেষ্ঠীর শুভেচ্ছা উপলব্ধি করে ভিক্ষু সংঘের জন্য বিহার নির্মাণের জন্য অনুমতি দিলেন। ভিক্ষুদের জন্য ৪০০টি কুটীর নির্মাণ করে রাজগৃহ শ্রেষ্ঠী তা উৎসর্গের জন্য বুদ্ধ প্রমুখ ভিক্ষুসংঘকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন; আর সেদিনই বুদ্ধ দান অনুমোদন করে বললেন, ‘সর্ব প্রকার অমঙ্গল দূর হোক, এই দান হতে পুণ্য রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হোক, এটি সর্ব মানবগণের চিরন্তন মঙ্গল সরূপ হোক।’ এই সময়ে অনাথের অন্নদাতা নামে খ্যাত শ্রেষ্ঠী অনাথপি-িক গেছেন স্বীয় ভগ্নিপতি ও শ্যালক রাজগৃহ শ্রেষ্ঠীর বাড়িতে এবং পেলেন ধর্মাধিরাজ তথাগত দর্শন, অর্জন করলেন স্রোতাপত্তি মার্গ; নিমন্ত্রণ করলেন ভগবানকে শ্রাবস্তীতে পদার্পণের জন্য।

অশোকনন্দন মহেন্দ্র স্থবিরের সিংহল গমন ও পরিনির্বাণ বুদ্ধের সদ্ধর্ম প্রচার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজন্যবর্গের অবদান অপরিসীম। যে সকল রাজা, মহারাজা ও সম্রাট মহান সম্বুদ্ধ শাসনকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন তন্মধ্যে মৌর্য সম্রাট অশোক অনন্য। বিশেষত তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় সংঘায়ন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ৮৪ হাজার চৈত্য, স্থাপন করান বুদ্ধ ধাতু, প্রতিষ্ঠা করেন বুদ্ধবাণী সম্বলিত বহু শিলালিপি, শাসনে পুত্র-কন্যা দান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তাঁর সময়ে অনুষ্ঠিত তৃতীয় সংগীতির সভাপতি মোগ্গগলিপুত্ততিস্স মহাস্থবিরের নির্দেশনায় ও সম্রাট অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় সদ্ধর্মের প্রচার ও প্রসারের জন্য অশোক পুত্র অর্হৎ মহেন্দ্র স্থবিরকে সিংহল দ্বীপে, সোণ ও উত্তর নামক থেরকে সুবণ্নভূমিতে, মহারক্ষিত থেরকে যোনক লোকে, যোনক রক্ষিত থেরকে বনবাসী রাজ্যে, থের ধম্মরক্ষিতকে অপরান্তরাজ্যে, মজ্ঝান্তিক থেরকে কাশ্মীর-গান্ধার রাজ্যে, মহারেবত থেরকে মহিংসক ম-লে, থের মহাধম্মরক্ষিতকে মহারাষ্ট্রে এবং থের মজ্ঝিমকে হিমবন্তও চীন সাম্রাজ্যে পাঠান। প্রত্যেক ধর্মদূতের সঙ্গে উপসম্পদা কার্যের উপযোগী ভিক্ষুসংঘও পাঠানো হয়েছিল। সম্রাট অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় দূত পাঠানোর উল্লিখিত নয়টি রাজ্যের বিবরণ ভারতীয় সংঘরাজ তত্ত্বভূষণ মহাপণ্ডিত (প্রয়াত) ধর্মাধার মহাস্থবির কর্তৃক অনূদিত শাসনবংশে উল্লেখ আছে। আগ্রহী পাঠক ইচ্ছা করলে ‘শাসনবংশ’ হতে উল্লিখিত নয়টি রাজ্যের বিবরণ জেনে নিতে পারেন। ভগবানের মহাপরিনির্বাণের ২৩৬ বর্ষে জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে সম্বুদ্ধ শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য সম্রাট অশোকপুত্র স্থবির মহেন্দ্র আকাশমার্গে সিংহলে (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) দ্বীপ গমন করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ইত্থিয়, উত্তিয়, সম্বাল ও ভদ্দশাল নামক চারজন স্থবির এবং ভাগিনেয় শ্রামণ সুমন ও ভণ্ডুক নামক এক উপাসক। জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা ছিল সিংহলবাসীদের নক্ষত্র উৎসব। তথাকার রাজা দেবান্মপিয়তিস্স তাঁর অমাত্যগণকে উৎসবের আয়োজন করার জন্য নির্দেশ দিলেন এবং নিজেও চল্লিশ হাজার পুরুষ পরিবৃত হয়ে মৃগয়া (হরিণ শিকার) মানসে মিস্সক পর্বতের দিকে যাত্রা করলেন। সেই মিস্সক পর্বতে তখন অবস্থান নিয়েছেন সদ্যাগত মাননীয় মহেন্দ্র স্থবির ও তাঁর সঙ্গে আগতগণ। রাজা যখন মিস্সক পর্বতাভিমুখে যাত্রা আরম্ভ করেছে তখন সেই পর্বতের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা মৃগরূপ ধারণ করে রাজাকে প্রলুব্ধ ও আকর্ষণ পূর্বক পর্বতাভ্যন্তরে যেথায় মহেন্দ্র স্থবির অবস্থান করছেন সেথায় নিয়ে গেলেন। রাজাকে দেখে ঋদ্ধি সম্পন্ন স্থবির মহেন্দ্র অধিষ্ঠান করলেন এই বলে ‘রাজা যেন কেবল আমাকেই দেখতে পায়, অন্য কাউকে নয়, এবং বললেন তিস্স! তিস্স! এদিকে এস!’ রাজার নিজের নাম ধরে আহ্বানরত স্থবিরকে দেখে রাজা চিন্তা করলেন ‘এ দ্বীপে যাঁদের জন্ম তাঁদের মধ্যে এমন কোনো লোক নেই যাঁরা আমাকে নাম ধরে ডাকবেন অথচ ইনি মু-িত মস্তক ছিন্ন ভিন্ন কাষায় বস্ত্রধারী লোক, আমায় নাম ধরে ডাকছেন। ইনি কে! ইনি কি মানুষ না অমানুষ! রাজার চিত্ত বিতর্ক অবগত হয়ে স্থবির মহেন্দ্র বললেন, ‘হে মহারাজ, আমরা শ্রমণ, ধর্মরাজ বুদ্ধের শ্রাবক, আপনার প্রতি অনুকম্পাবশত জম্বুদ্বীপ হতে এখানে এসেছি।’ রাজা স্থবির মহেন্দ্রের বচন শ্রবণে চিন্তা করলেন, ‘আর্যেরা আসলেন কি? এবং সঙ্গে সঙ্গেই হস্তস্থিত রাজায়ুধ পরিত্যাগ করে এক প্রান্তে বসে পড়লেন। উভয়ের মধ্যে কুশলাকুশল এবং বিবিধ আলাপ হলো এবং এ সময়ে রাজানুচর সেই চল্লিশ হাজার লোক সেখানে এসে রাজার সঙ্গে সম্মিলিত হলেন। তখন স্থবিরও অপর ছয় জনকে দেখালেন। অতঃপর বিভিন্ন প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে রাজা অবগত হলেন মহেন্দ্র স্থবির ক্ষীণাসব অর্হৎ। মহেন্দ্র স্থবিরও বুঝতে পারলেন রাজা প-িত। অতঃপর স্থবির রাজাকে ক্ষুদ্র হস্তিপদোপম সূত্র দেশনা করেন। দেশনাবসানে রাজা তাঁর চল্লিশ সহস্র অনুগামীসহ ত্রিশরণে প্রতিষ্ঠিত হলেন। এরপর হতে স্থবির মহেন্দ্র সিংহলদ্বীপে সম্বুদ্ধের শাসন প্রতিষ্টায় বিবিধ কার্যক্রম সম্পাদন করেন। বিভিন্ন বিহার চৈত্য যেমন তিস্যারাম, থূপারাম, বেস্সগিরি, চোলক তিস্যারাম ইত্যাদি তিনি রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠা করেন এবং করান। এভাবে সিংহল দ্বীপে বুদ্ধের অমৃতোপম ধর্ম প্রচার প্রসার করে মহান সম্রাট অশোক ও সম্রাজ্ঞী দেবী’র পুত্র অর্হৎ স্থবির মহেন্দ্র ষাট বৎসর বয়সে রাজা উত্তিয়ের রাজত্বের অষ্টম বর্ষে চৈত্য বা চেতিয় পর্বতে বর্ষাবাস করার সময় আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী দিবসে নির্বাপিত হন।