মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২ ||

তথাগত অনলাইন |বুড্ডিস্ট নিউজ পোর্টাল

প্রকাশের সময়:
সোমবার , ১৩ জুন ২০২২, ১২.৫১

123

ভদন্ত স্বরূপানন্দ ভিক্ষু

ত্যাগ ও কর্মে প্রতিভায় উজ্জ্বল প্রজ্ঞাসারথী ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির

প্রকাশের সময়: সোমবার , ১৩ জুন ২০২২, ১২.৫১

123

ভদন্ত স্বরূপানন্দ ভিক্ষু

ত্যাগ ও কর্মে প্রতিভায় উজ্জ্বল  প্রজ্ঞাসারথী ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির

চট্টগ্রামের কর্ণফুলি ও সাঙ্গু নদীর সংযোগকারী চানখালী খাল ঘেঁষা আনোয়ারা থানাধীন তিশরী গ্রাম। তিনি তিশরী গ্রামে ১৯৫৪ সালের ১৩ই জুন সমাজসেবক সুবোধ রঞ্জন বড়ুয়া ও ধার্মিক উপাসিকা শ্রীমতি কনকপ্রভা বড়ুয়ার কোল আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেন প্রভাষ রঞ্জন বড়ুয়া। যার বর্তমান নাম প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির। ১৯৭১ সালে বালাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহন ও প্রশিক্ষনের জন্য ভারতে গমন করেন। স্বাধীনতার পর যুবক প্রভাষ রঞ্জন বড়ুয়া গ্রামের সামাজিক ও ধর্মীয় সেবার কাজে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ১৯৭৫ সালে তিশরী প্রগতি সংঘের সাধারণ সম্পাদক দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সামাজিক ও ধর্মীয় কাজ করতে গিয়ে সংসারের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েন। কি করবে ভাবতে ভাবতে এক সময় তিনি রাঙামাটি জেলাস্থ পূজ্য আর্যশ্রাবক সাধনানন্দ মহাথেরো-বনভান্তের রাজবন বিহারে দর্শনে যান। বিমুক্ত পুরুষ বনভান্তের জীবনচর্চা দেখে প্রভাষ রঞ্জন বড়ুয়া প্রব্যাজ্যা গ্রহণের মনস্থির করেন। ঠিক তখনই সাক্ষাত হয় সংসার ত্যাগী বৌদ্ধ জগতের কীর্তিমান ভিক্ষু বিদর্শনাচার্য ভিক্ষু প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো (রামুর অরুন মহাজন) ।১৯৮১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাজবন বিহারের পূণ্যভুমিতে পূজ্য আর্যশ্রাবক সাধনানন্দ মহাথেরোর উপস্থিতিতে বিদর্শনাচার্য প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরোকে আচার্য করে প্রভাষ রঞ্জন বড়ুয়া প্রব্যাজ্যা ধর্মে দিক্ষীত হন। তখন তার নামকরণ হয় প্রজ্ঞানন্দ শ্রামণ।

প্রজ্ঞানন্দ শ্রামন ১৯৮৩ সালের ৩রা নভেম্বর শাকপুরা বোয়ালখালির নদীর উদক সীমায় বিদর্শনাচার্য প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরোকে আচার্য করে পবিত্র উপসম্পদা লাভ করেন।
পবিত্র ভিক্ষু জীবন লাভ করে প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু ধর্ম-বিনয়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য বৌদ্ধ প্রতিরূপ দেশ শ্রীলংকায় গমন করেন। ১৯৮৫ সালের ৫ই মার্চ পন্ডিত প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরোর (বর্তমান আমেরিকা) সহায়তায় শ্রীলংকার বিখ্যাত মহরাগামা ট্রেনিং সেন্টারে গমন করেন। অমরাপুর নিকায়ের সংঘরাজ পন্ডিত মাডিহে পঞঞসিংহ মহানায়কা থেরোর সান্নিধ্যে ৫ বছর যাবত ধর্ম বিনয়ে অধ্যয়ন করেন।

১৯৯০ সালে প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু থাইল্যান্ডের বিখ্যাত ওয়াটপাক নাম বিহারে গমন করেন। সেখানে তিনি বন্ধুবর জ্ঞানরত্ন ভিক্ষুর (অধ্যাপক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) সাথে অবস্থান করে ধর্ম বিনয় চর্চার প্রত্যক্ষ অনুশীলনে জ্ঞানার্জন করেন।

পরবর্তীতে ২০০৩ সালে ২৫জুন ধর্মমিত্র মহাথেরসহ ( অধ্যক্ষ, আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার, ঢাকা) মায়ানমার গমন করেন। সেখানে দুই বছর উ. পান্ডিতারাম মেডিটেশন সেন্টারে অবস্থান করেন এবং বিদর্শন ভাবনা অনুশীলন ও প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন।

১৯৯০ সালে থাইল্যান্ড থেকে স্বদেশে ফিরে গুরুর প্রতিষ্টিত বিদর্শনাচার্য প্রজ্ঞাবংশ বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রে গুরুর সাথে এক বর্ষা যাপন করেন।
পরবর্তীতে চন্দনাইশ থানাধীন কানাইমাদারী গ্রামবাসীর ঐকান্তিক শ্রদ্ধার আহ্বানে গুরুভান্তের আদেশে প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু ১৯৯১ সালে ১৫ই জুলাই কানাইমাদারী বিদর্শনারাম বিহারের অধ্যক্ষ পদ গ্রহন করেন। কানাইমাদারী বিহারের অধ্যক্ষ গ্রহনের পর উক্ত গ্রাম ও বিহারের বহুবিধ উন্নয়ন ও নির্মাণ কার্য সম্পাদন করেন। উক্ত বিহারটি নবরূপ লাভ করে। অগ্রমহাপন্ডিত প্রজ্ঞালোক মহাথেরোর কর্মকীর্তি গুলোর আদর্শ নিজে ধারণ করেন গ্রামবাসীদের উজ্জিবীত করেন। ১৯৯৪ সালে চন্দনাইশ ভিক্ষু পরিষদ গঠন করে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন।

বৌদ্ধ জগতের কুল রবি, ব্যাকরনবিদ, পন্ডিত, বিনয়াচার্য বংশদ্বীপ মহাথেরোর সাধনপীঠ পটিয়া থানাস্থ কর্ত্তালা-বেলখাইন সদ্ধর্মালংকার বিহার। ১৯৯৭ সালে কর্ত্তালা-বেলখাইন গ্রামদ্বয়ের গ্রামবাসীর ঐকান্তিক শ্রদ্ধার আহ্বানে সদ্ধর্মালংকার বিহারের অধ্যক্ষ পদ গ্রহণ করেন। প্রয়াত পূজ্য বিনয়াচার্য বংশদ্বীপ মহাথেরোর প্রতি অনুরাগী সদ্ধর্মালংকার বিহারের দায়ক-দায়িকাগণ ১৯৭২ সাল হতে প্রতিবছর ২২শে ফাল্গুন প্রয়াত স্মরনে সংঘদান ও স্মৃতিচারণ সভা করে আসছিলেন। ১৯৯৮ সালে প্রজ্ঞানন্দ থেরো সে সভার ১০দিন পূর্ব হতে বিদর্শন ভাবনা কোর্স সংযুক্ত করেন। কর্তালা-বেলখাইন গ্রামবাসী বিনয়াচার্য বংশদ্বীপ মহাথেরোর উত্তরসুরী পেয়ে মহাখুশী। তাই তারা প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরের সুন্দর সৃজনশীল নেতৃত্বে সদ্ধর্মালংকার বিহারের কাজ দুরন্ত গতিতে ছুটে চলে। একের পর এক দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা নির্মাণ করে স্বর্গীয় রূপ দান করেন প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরোর বলিষ্ট কর্মদক্ষতা ও সুন্দর নেতৃত্বে। যেমন- বুদ্ধ মন্দির চৈত্য, ধাতু চৈত্য, বুদ্ধের পরিনির্বাণ চৈত্য, পবিত্র ভিক্ষু সীমা, পবিত্র বোধিবৃক্ষের চতুর্দিকে অষ্টবিংশতি বুদ্ধমূর্তিসহ বোধি মন্ডপ, পঞ্চবর্গীয় শিষ্যসহ বুদ্ধমূর্তি, বংশদ্বীপ ভিক্ষু নিবাস, মারবিজয়ী অরহৎ উপগুপ্ত স্থবিরের মূর্তিসহ চৈত্য, পুকুরে মুচলিন্দ চৈত্য, বিনয়াচার্য বংশদ্বীপ মহাস্থবিরের স্মৃতি চৈত্য।
বর্তমানে ৩ কোটি টাকার বংশদ্বীপ পরিবেণের বিশাল কর্মযজ্ঞ অত্র গ্রামদ্বয়ের সহযোগিতায় এবং উপাধ্যক্ষ বিদর্শন গুরু ভদন্ত উ পঞ্ঞাতিলক মহাথেরোকে সঙ্গে নিয়ে কর্মবীর প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির সুদৃঢ় নেতৃত্বে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। গত ১৫ এপ্রিল ২০২২ কর্ত্তালা বেলখাইন সদ্ধর্মালংকার বেদ্ধৈ বিহারে মহাসমারোহে নির্মাণাধীন বংশদীপ পরিবেণের তৃতীয় তলায় নান্দনিক স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত “বুদ্ধ ধাতু চেতিয়” উৎসর্গ ও অভিষেক অনুষ্ঠান মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত পূজারীরা উক্ত বিহার দেখে বিমোহিত হন। এটির নির্মাণ কাজ পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের আদর্শ ও অন্যতম দৃষ্টিনন্দন বিহার হিসেবে বিশ্বের বৌদ্ধদের কাছে জায়গা করে নিবে।
সমাজ ও সদ্ধর্মের প্রতি নিবেদিত কর্মস্পৃহা অন্তর দেখে কর্ত্তালা-বেলখাইন সদ্ধর্মালংকার বিহারের দায়ক-দায়িকা ২০১২ সালে প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরকে অত্র বিহারের আজীবন অধ্যক্ষ পদে বরণ করে নেন।
২০১৩ সালের ১৩ই মার্চ কর্তালা-বেলখাইন গ্রামদ্বয়ের সকলে মহাসমারোহে ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ স্থবিরকে মহাস্থবির বরণ করে তার কর্ম ও কীর্তির জন্য কৃতজ্ঞতা নিবেদন করেন।
১৯৯৯ সালে প্রজ্ঞানন্দ থের সংঘরাজ পূর্ণাচার ভিক্ষু সংসদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্বকালিন সময়ে ২০০০ সালে তিনি সংঘরাজ পূর্ণাচার ভিক্ষু সংসদের প্রভাতী ধর্মীয় শিক্ষার প্রবর্তন করেন এবং প্রভাতী বৃত্তি পরীক্ষা চালু করেন। শূণ্য ফান্ড অবস্থায় দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি সংসদের জন্য একটি স্থায়ী ফান্ড প্রতিষ্টা করেন। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে জুলাই মাসে প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির সংঘরাজ পূর্ণাচার ভিক্ষু সংসদের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ড. সংঘপ্রিয় মহাথেরো সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। যা দুজনে বর্তমানে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পালন করে যাচ্ছেন।
২০০২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর নিজগুরু প্রয়াত প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো মহোদয়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কর্মবীর প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরের একক নেতৃত্বে শাকপুরা গ্রামবাসির সহায়তায় সুসম্পন্ন করেন। গুরু ভান্তে প্রয়াণের পর থেকে শাকপুরা প্রজ্ঞাবংশ বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রের মহাপরিচালকের দায়িত¦ ভার গ্রহণ করেন এবং এ প্রতিষ্ঠানকেও দৃষ্টিনন্দন রূপ দানে সচেষ্টায় আছেন।
২০০৩ সালের ২০শে মে পটিয়ার ২৩টি গ্রাম মিলে সম্মিলিত বুদ্ধ পূর্ণিমা উদযাপন কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৬ সালে শাকপুরা তপোবন বিহারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দানবীর বাবু নির্মলেন্দু বড়–য়ার একক অর্থায়নে প্রায় এককোটি টাকার ব্যয়ে প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরের কঠোর পরিশ্রম ও মেধায় দৃষ্টিনন্দন আধুনিক নির্মাণশৈলী দিয়ে তপোবন বিহার অপার সৌন্দর্য লাভ করে।
২০০৮ সালে প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি -ঢাকা অঞ্চলের আহŸানে বাংলাদেশ মহাবিহারের প্রতিষ্টাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর কর্ম তৎপরতায় ও ঢাকা অঞ্চলের সদস্যদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০১১ সালে উত্তরায় উক্ত বিহারের জন্য ২বিঘা জমি বরাদ্দ প্রদান করেন।
২০১৫ সালে বাংলাদেশ বৌদ্ধ মহাবিহার উত্তরার স্থায়ী জায়গায় স্থানন্তরিত হয়, তখন নদ্দায় অস্থায়ী বিহারটি প্রজ্ঞানন্দ বৌদ্ধ বিহার নামকরণ করা হয়। এ নামকরণ করেন বিশিষ্টি ব্যবসায়ী দানবীর স্বপন বড়ুয়া চৌধুরী।

কর্তালা জন্মজাত সূর্যসন্তান অখিল ভারতীয় সংঘনায়ক, ভারতীয় রাজ্যসভার প্রাক্তন সদস্য, অতীশ দীপংকর ও কৃপাশরন বুড্ডিস্ট মিশনের প্রতিষ্ঠাতা, ভারতীয় সংখ্যালঘু কমিশন ও ভারতীয় ট্রাইপেড বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ড. ধম্মবিরিয়ো মহাথেরো। ২০১০ সালের ৯ এপ্রিল কর্তালা-বেলখাইন সদ্ধর্মালঙ্কার বিহারের সকল দায়ক-দায়িকা ও কর্তলা-বেলখাইন গ্রামবাসীর সমন্বয়ে প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরকে সভাপতি করে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠনের মাধম্যে ড. ধম্মবিরিয়ো মহাস্থবিরের জন্ম-জয়ন্তি মহাসমারোহে উদ্যাপন করা হয়।
২০১৩ সালের ১ মার্চ ঐতিহ্যবাহী গ্রাম মহামুনি গ্রামবাসী ও বর্তমান উপসংঘরাজ ধর্মপ্রিয় মহাথেরো কর্তৃক প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরকে “সদ্ধর্মশ্রী” উপাধি প্রদান করেন।
২০১৪ সালের ৬ই জুন বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা কর্তৃক “প্রজ্ঞাসারথী” উপাধি লাভ করেন। ২০১৫ সালের ১৯ নভেম্বর প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরের প্রিয় শিষ্য সুদেশক রতনানন্দ থেরসহ বুদ্ধের পদচারণার স্থান ভারতে সকল তীর্থস্থানসমূহ ভ্রমণ করেন। এর পূর্বে আরো বেশ কয়েকবার ভারতে তীর্থভ্রমণে গিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের আষাঢ়ী পূর্ণিমার আগের দিন ২৬ জুলাই রূপানন্দ থের ও আমাকে নিয়ে প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির বাশঁখালির জলদি গ্রামে গমন করেন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সমস্যা নিরসনে তিনি অফুরন্ত চেষ্টা করেন এবং চলমান সমস্যার একটি স্থিতিশীলতা আনেন।

প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির অষ্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশী ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধদের সংগঠন “অস্ট্রেলিয়া বুড্ডিস্ট সোসাইটির” আহ্বানে ২০১৮ সালে ২৭ই অক্টোবর ধর্ম সফরে অষ্ট্রেলিয়া গমন করেন। দীর্ঘ আড়াই মাস অষ্ট্রেলিয়া অবস্থান করে সেখানে ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধদের ধর্মপ্রচার করেন। অষ্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকালে বাংলাদেশী জন্মজাত ছেয়াদ আদিচ্ছা মহাথেরোর আতিথ্য গ্রহণ করেন।

২০১৯ সালে ৭/৮ ফেব্রুয়ারি ঐতিহ্যবাহী পন্ডিত প্রজ্ঞাতিষ্য মহাস্থবিরের সাধনপীঠ তালসারা মুচ্ছদ্দী পাড়া বিবেকারাম বিহারের অধ্যক্ষ সৌম্য সারথী শাসনমিত্র মহাথেরোর সুবর্ণ জয়ন্তিতে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন এবং সুচারুভাবে অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন করেন।
পন্ডিত প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরোর আমন্ত্রণে ২০১৯ সালের ১৪ই অক্টোবর প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির ড.জ্ঞানরতœ মহাস্থবিরসহ আমেরিকায় গমন করেন। আমেরিকায় পরবর্তীতে বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার মহাসচিব (সাবেক) এস. লোকজিত থেরোসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে কঠীন চীবর দানে অংশগ্রহণ করে ধর্মদান করেন।
২০২১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারী চট্টগ্রামস্থ দেবপাহাড় পূর্ণাচার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে বাংলাদেশী বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ সাংঘিক সংগঠন “বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা” ত্রয়োদশ সংঘরাজ শাসনশোভন ড. জ্ঞানশ্রী মহাথেরোর উপস্থিতিতে নতুন কার্যকরী কমিটি ঘোষণা করা হয়। জ্ঞাননিধি ভদন্ত বুদ্ধরক্ষিত মহাথেরোকে সভাপতি ও ড. সংঘপ্রিয় মহাথেরোকে সাধারণ সম্পাদক করে ৬১ সদস্যের কার্যকরী কমিটি করা হয়। উক্ত কমিটিতে প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরোকে সহ-সভাপতি করা হয়। সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মহাসভার শাসন-সদ্ধর্মের উন্নয়নের কর্মকাণ্ডে বলিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।
২০২১ সালের ২৬ ফেব্রæয়ারী বাংলাদেশী বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু মহামান্য দ্বাদশ সংঘরাজ ড. ধর্মসেন মহাথেরোর “জাতীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া উদযাপন পরিষদ” এর সভাপতি হিসেবে প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরের সুদৃঢ় নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক মানের মহাসমারোহে, জাঁকজমকপূর্ণভাবে, রাজকীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সুসম্পন্ন হয়। যা দেশে-বিদেশী সকলের কাছে প্রশংসার কুড়িয়েছেন, সমাদৃত হয়েছেন বিশ্বব্যাপী।
২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর রাত ১১.১৫ মিনিটে ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরের মমতাময়ী মাতা কনক প্রভা বড়ুয়া প্রায় ৯৫ বৎসর বয়সে পরলোক গমন করেন। ২৬ নভেম্বর শুক্রবার সমগ্র বাংলাদেশের উভয় নিকায়ের দেড় শতাধিক ভিক্ষু সংঘ ও হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে গর্ভধারিণী মাতার শেষ কৃত্যানুষ্ঠান সম্পাদান করেন এবং ৩০ শে নভেম্বর উভয় নিকায়ের দুই শতাধিক ভিক্ষু-সংঘ ও হাজারের অধিক মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে করুণাময়ী মাতার সাপ্তাহিক সংঘদান সুসম্পন্ন করেন। এর আগে ৩রা জুলাই ২০০৮ সালে ব্রহ্মতুল্য পিতা সমাজসেবক সুবোধ রঞ্জন বড়ুয়াকে হারান। পিতার শেষ কৃত্যানুষ্ঠান ও সাপ্তাহিক সংঘদান মহাসমারোহে সম্পাদন করেন। ২০২২ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি অনেক গুণী-পণ্ডিত ভিক্ষু সংঘের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ বৌদ্ধ মহাবিহার, উত্তরায় প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরের তত্ত্বাবধানে সীমাঘর প্রতিষ্ঠিত করা হয়। উপস্থিত ভিক্ষু-সংঘ ও ভক্তদের অনুরোধে উক্ত সীমাঘরটির নামকরণ করা হয় "প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু সীমা" শিক্ষানুরাগী, কর্ম দক্ষতা, অসীম ধৈর্য,পরদুঃখপরতা, পরার্থপরতা,ত্যাগশীলতা, শাসন-সদ্ধর্ম ও সমাজের জন্য নিবেদিত প্রজ্ঞাদীপ্ত আজকের প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির। ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির শিক্ষা অর্জনকে খুবই গুরুত্ব প্রদান করেন। তাঁর সান্নিধ্যে ও সহায়তায় অনেক ভিক্ষু ও সন্তান দেশে-বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রিসহ নানাভাবে প্রতিষ্টিত হয়েছেন। যারা ইতোমধ্যে দেশে-বিদেশে আলো ছড়াচ্ছে। প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির সমাজে শিক্ষিত, উদার সমাজসেবী ও সদ্ধর্মসেবীদের গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়িত করেন। প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরের কর্মপ্রতিভা, অসীম ধৈর্যশীলতা, সুন্দর ও সৃজনশীল মনন, মেধা ও পরিশ্রমের জন্য বাংলার বুকে দৃষ্টিনন্দন প্রতিষ্ঠান গুলো আজ গৌরবের আসনে দীপ্তিমান।পরদুঃখপরতা ও পরার্থপরতার জন্য প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির বড়-ছোট সকল ভিক্ষু-সংঘ এবং সমাজের সকল বর্ণের, সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে প্রিয় ও শ্রদ্ধা-সম্মানের ব্যক্তি। তাঁর এ মহৎ দয়া ও মায়ার জন্য বৌদ্ধ সমাজের অনেক তরুণ প্রতিভাবান সন্তান সান্নিধ্যে পেয়েছেন এবং প্রব্রজিত হয়েছেন। প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির হচ্ছেন নির্লোভ-নির্মোহ। কোন ব্যক্তির মোহ বা অর্থলোভের কাছে কখনো তিনি আদর্শচ্যুত হননি। তাঁর এ অপার ত্যাগশীলতার জন্য তিনি তৈরী করেছেন সীমাহীন ব্যক্তিত্ব।অসামান্য আত্মশক্তি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রের চেয়ে কঠোর। সমস্ত অবয়বের মধ্যে সম্যক সংকল্পে অটুট থাকার দৃঢ়তা। হাজারো বাধাঁ সামনে এসে ক্ষত-বিক্ষত করলেও স্বীয় আদর্শ আর নীতিতে অটল থেকে সততা ও প্রজ্ঞাগুণে তিনি কার্য সম্পাদন করে যাচ্ছেন। প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির কারো কারে তোষামোদ করতে জানেন না। কর্মবীর প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির শাসন-সদ্ধর্মের জন্য প্রতিনিয়ত চিন্তা করেন। সদ্ধর্মের কোন অবক্ষয় দেখলে তিনি কায়-বাক্য-মনে তা উত্তরনের জন্য পরিশ্রম করেন। তার পরিশ্রম ও সৃজনশীল প্রতিভার মধ্যে দিয়ে সৃষ্টির নিদর্শন যুগ যুগ ধরে বৌদ্ধ মহাকাশে আলো ছড়াবে। তাই তিনি থেরবাদ বৌদ্ধ আকাশে দেদিপ্যমান উজ্জ্বল সাংঘিক নক্ষত্র।

তথ্য সংগ্রহে: কর্মবীর প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরের শিষ্য ভদন্ত স্বরুপানন্দ ভিক্ষু (এম.এ)।অন্তেবাসী- আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার, ঢাকা।