মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২ ||

তথাগত অনলাইন |বুড্ডিস্ট নিউজ পোর্টাল

প্রকাশের সময়:
রবিবার , ১৫মে ২০২২, ,৭ টা

119

শতদল বড়ুয়া

আজ শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তথা বুদ্ধ পূর্ণিমা

প্রকাশের সময়: রবিবার , ১৫মে ২০২২, ,৭ টা

119

শতদল বড়ুয়া

আজ শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তথা বুদ্ধ পূর্ণিমা

আজ শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তথা বুদ্ধ পূর্ণিমা। আজকের দিনটি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য এক অবিস্মরণীয় দিন।কারণ, এ তিথি ঘিরে রয়েছে তথাগত বুদ্ধের তিনটি স্মরণীয় ঘটনা। ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত এ তিথির তাৎপর্য অত্যন্ত বিশাল। সব পূর্ণিমা তিথি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য কোন না কোন গুরুত্ব বহন করে। তবে আজকের তিথির সঙ্গে রয়েছে অন্য তিথিগুলোর বিস্তর ফারাক। গভীর রাত, পুণ্যবতী মায়াদেবী রাজপালঙ্কে অঘোর নিদ্রায় মগ্ন। ঘুমন্ত অবস্থায় তিনি স্বপ্ন দেখলেন। সেদিন ছিল কপিলাবস্তু নগরীতে আষাঢ়ী পূর্ণিমার উৎসব। রানী সারাদিন উৎসবে মেতে ক্লান্ত শরীরে শেষ রাতে স্বপ্নে দেখলেন, চারদিক থেকে চার দিকপাল এসে তাকে শয্যাসহ তুলে নিলেন। চাঁদের জ্যোৎস্না ছড়ানো রমণীয় এক হ্রদে রানী দেখলেন সহস্রদল পদ্ম। লাবণ্য আর লালিমায় রক্তিম। এক সাদা হস্তী সেই হ্রদে জলকেলি করছে। হস্তীটি মায়াদেবীর আগমনে সামনে এগিয়ে এলো। একটি বর্ণময় পদ্ম মায়াদেবীর ডান কুক্ষিতে প্রবেশ করিয়ে দিল হস্তীটি। এতে রানীর দেহমনে এক অপূর্ব শিহরণ জাগ্রত হলো। মায়াদেবীর ঘুম ভেঙ্গে গেল। তিনি পালঙ্কে উঠে বসলেন। শাক্যরাজ্যের প্রাণপুরুষ রাজা শুদ্ধোধনের রাজমহিষী তিনি। এ আমি কী দেখলাম! পরদিন রানী রাজা শুদ্ধোধনের কাছে স্বপ্নের কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করলেন। রাজা কালবিলম্ব না করে জ্যোতিষীদের ডেকে পাঠালেন এবং জ্যোতিষীদের কাছ থেকে রানীর স্বপ্নের বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইলেন। জ্যোতিষীরা বললেন- মহারাজ, রানী মায়াদেবীর পুত্রসন্তান হবে। এই পুত্র মহাতেজস্বী ও যশস্বী মহাপরুষ হবেন। শান্ত, গভীর, জগতে দুর্লভ, জীবের দুঃখহারী ও মহাজ্ঞানী পুত্রের জনক হবেন আপনি। তবে এখানে নৈরাশ্য এবং বেদনার সংবাদও জড়িয়ে রয়েছে। আছে কিছু বিয়োগ-বিচ্ছেদের অশনিসঙ্কেত। রাজা শুদ্ধোধন অতলায়িত বিস্ময়ে তাকিয়ে জ্যোতিষীদের নির্দেশ করলেন ঘটনা খুলে বলার জন্য। তারা বললেন, পুত্রসন্তান লাভের সাত দিন পর মায়াদেবীর অকালমৃত্যু ঘটবে। এ মৃত্যু অমোঘ, অনিবার্য। একদিকে রাজপ্রাসাদে মহাপুরুষের আগমন সংবাদ, অপরদিকে মায়াদেবীর আসন্ন মৃত্যু সংবাদে রাজা শুদ্ধোধন বিচলিত। আসন্ন প্রসবা মায়াদেবীর রূপ যেন বাঁধ মানছে না। যেন লাবণ্য বারিধি উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে। ভূকৈলাসের রাজা আসবেন এ মর্ত্যভূমিতে। জ্যোতি রূপোজ্জ্বল। প্রাণময়ী পরামার্থা। যুগে যুগে মহাপুরুষরা এভাবেই পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন। যথাসময়ে মায়াদেবী পিত্রালয় দেবদহনগরে যাওয়ার জন্য রাজার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করলেন। মায়াদেবী দেবদহনগরের রাজা সূত্রবুদ্ধের জ্যেষ্ঠ কন্যা। এলো বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। ইতোপূর্বে রাজা, রানীর বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য সব ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করে রেখেছিলেন।নির্দিষ্ট দিনে সন্তানসম্ভবা মায়াদেবী সখীদলসহ রথে চড়ে বাপের বাড়ির দিকে যাত্রা শুরু করলেন। মুখে তাঁর অপরূপ লাবণ্য, বেদনা, করুণা আর ধৃতির ¯িœগ্ধতা। তিনি হবেন আলোকসুন্দর দিব্য পুরুষের জন্মদাত্রী। সৃষ্টির পূর্ণতা ও অনুপম সৌন্দর্যে সমুজ্জ্বল। বাপের বাড়ি যাওয়ার পথে লুম্বিনী কাননে পৌঁছামাত্রই মায়াদেবীর প্রসববেদনা শুরু হলো। এক পদ্ম-পলাশ-লোচন ব্রহ্মযোগযুক্ত আত্মভোলা শিশু জগতের ভাবী বুদ্ধের জন্ম হলো। লুম্বিনী উদ্যান হয়ে উঠল সৃষ্টির উৎসারিত আলোক সমুদ্র। পূর্ণতার পরমতম আকর্ষণ। মায়াদেবী উদাসীন অথচ আনন্দময়ী, জগজ্জননী জ্যোর্তিময়ী। মহাসমারোহে শোভাযাত্রাসহকারে মাতা ও তেজস্বী নবজাতককে লুম্বিনীকাকন থেকে কপিলাবস্তু নগরের রাজপ্রাসাদে ফিরিয়ে আনা হলো। এইদিনে গয়ার বোধিগাছ, রাহুলমাতা গোপাদেবী, চার নিধিকুম্ভ, চার মঙ্গল হস্তী, সারথি ছন্দক এবং অমাত্যপুত্র উদায়ীও জন্মগ্রহণ করেন। মহাপুরুষ গৌতমের সঙ্গে তারা প্রত্যেকে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। সেই দিনটি ছিল আজকের বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। দিব্যজ্ঞানস্বরূপ সাধনাসম্ভূত জ্যোতির্ময় পুরুষের জন্মের সাতদিন পর মায়াদেবীর অকালমৃত্যু হয়। মায়াদেবীর মৃত্যুতে রাজ্যময় নেমে এলো শোক। সেই প্রাচীনকালে রাজাদের মধ্যে বহুবিবাহ প্রথা চালু ছিল বিধায় রাজাশুদ্ধোধনেরও একাধিক মহিষী ছিলেন। এর মধ্যে মনোমাধুরী মায়াদেবীই ছিলেন রাজার প্রধান পতœী। রাজা তার অপর স্ত্রী গৌতমীকে সিদ্ধার্থের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ জানালেন। গৌতমীও বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে সিদ্ধার্থের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। ফলে, বিমাতা গৌতমীর অশেষ ¯েœহপরশে সিদ্ধার্থের শৈশব কাটতে লাগল। রাজকুমার সিদ্ধার্থ এখন পূর্ণ কিশোর, শান্ত মূর্তি। রাজা শুদ্ধোধন পুত্রের শিক্ষার কথা ভাবতে লাগলেন। সর্বোচ্চ এবং সর্বপ্রকার শিক্ষার জন্য শাক্যরাজের প-িতপ্রধান বিশ্বামিত্রকে নিযুক্ত করলেন। পরে এক শুভদিনে প-িতপ্রধান বিশ্বামিত্র রাজকুমারকে রাজা শুদ্ধোধনের কাছে এনে বললেন, রাজমহাশয় রাজকুমারের শিক্ষা শেষ। আমার কাছে তাকে দেয়ার মতো আর কোন কিছু অবশিষ্ট নেই। রাজকুমার দৈনিক শিক্ষায়তনেও মেধার বিকাশ ঘটালেন খুব অল্পসময়ে। তার আর কোন শিক্ষা বাকি নেই। সব বিদ্যায় পারদর্শী রাজকুমার। রাজপুত্রের উদাসীনতা কাটাতে নানা প্রচেষ্টা চালিয়েও রাজা সফলকাম হতে পারলেন না। একদিন তিনি রাজ্যে রথ প্রতিযোগিতার আয়োজন করলেন শুধু সিদ্ধার্থকে ফেরাতে। প্রতিযোগীরা হলেন- নন্দ, আনন্দ, দেবদত্ত এবং রাজপুত্র সিদ্ধার্থ। ঘোষণা করা হলো- প্রতিযোগিতায় যে প্রথম হবে তাকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হবে। যথারীতি প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। রথে ঘোড়া সংযোজন করল চার প্রতিযোগী। তারপর শুরু হলো যাত্রা। প্রথমে ধীর-মন্দগতিতে, পরে দ্রুত, আরও দ্রুত, ক্ষিপ্রগতিতে এবং সর্বশেষ উল্কাগতি। পলকে পলকে দৃশ্য পাল্টে যেতে লাগল। রাজকুমার চোখের পলকে শাক্যরাজ্য অতিক্রম করে চলে এলেন। পেছনে, অনেক পেছনে নন্দ, আনন্দ এবং দেবদত্ত। প্রতিযোগিতায় রাজকুমার সিদ্ধার্থ প্রথম হলেন। তাঁকে বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করা হলো রাজার ঘোষণা অনুযায়ী। এতে রাজার আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হলো। রাজপ্রাসাদের কুলললনারা ও সমবেত জনতা আনন্দ ধ্বনিতে সিদ্ধার্থকে জয়মাল্যে ভূষিত করে রাজপ্রাসাদে নিয়ে এলো। সিদ্ধার্থ জয়ী, প্রতিযোগিতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু এ প্রতিযোগিতায় তাঁর কোন আগ্রহ নেই, নেই কোন আনন্দ। তবু এ কাজ কর্তব্যবোধেই তিনি করলেন। এ তার কর্তব্য, পিতৃআজ্ঞা পালন।অতি সংক্ষেপে লিখলাম ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত ঘটনা। কুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করে কঠোর সাধনা এবং তপস্যার মাধ্যমে যেদিন বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন সেদিনও ছিল আজকের বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। বুদ্ধত্ব লাভের পর বৌদ্ধধর্ম প্রচার করে যেদিন তিনি মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন, সেদিনও ছিল আজকের বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। সবাইকে বুদ্ধ পূর্ণিমা তথা বৈশাখী পূর্ণিমার লালগোলাপ শুভেচ্ছা। সকলের জীবন অনাবিল আনন্দে ভরে উঠুক। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। লেখক : সাংবাদিক