মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২ ||

তথাগত অনলাইন |বুড্ডিস্ট নিউজ পোর্টাল

প্রকাশের সময়:
বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২২ ,০৫.৪০

187

সাজেদ রহমান

ভরত ভায়নায় খনন প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির আবিষ্কার

প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২২ ,০৫.৪০

187

সাজেদ রহমান

ভরত ভায়নায় খনন প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির আবিষ্কার

এক সময় উঁচু ঢিবির চারপাশে ছিল ছড়ানো-ছিটানো ইটের টুকরো। কেউ কেউ সেই টুকরা ইট নিয়ে বাড়িতে ব্যবহারও করেছেন। পরে প্রত্ন তত্ত্ব অধিদফতর খনন করে জানতে পেরেছে- এটি আদি মধ্যযুগীয় বৌদ্ধ মন্দির এবং এর নির্মাণকাল খ্রিঃ ৭ থেকে ৯ শতকের মধ্যবর্তী কোন সময়ে।ভরত ভায়না বৌদ্ধ মন্দির যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার ভরত ভায়না গ্রামে বুড়িভদ্রা নদীর ৩০০ মিটার পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। প্রখ্যাত প্রত্ন  তাত্ত্বিক কাশীনাথ দীক্ষিত ভরত ভায়না ঢিবি ও সংলগ্ন এলাকায় প্রথম জরিপ কাজ পরিচালনা করেন ১৯২২-২৩ সালে। পরবর্তীতে ১৯৮৪-৮৫, ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০১৫-১৬ সালে এই প্রতœস্থানে বাংলাদেশ প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর প্রতœতাত্ত্বিক খনন পরিচালনা করে। গঠন ও শৈলীর ভিত্তিতে উন্মোচিত স্থাপত্যটির প্রথম নির্মাণকাল খ্রিঃ ৭-৯ শতকের মধ্যবর্তী কোন সময় হতে পারে বলে তাদের ধারণা। উন্মোচিত স্থাপত্য কাঠামোর গাঠনিক ও বিবর্তনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে এটিকে বৌদ্ধ মন্দির বলে ধারণা করছেন প্রত্ন  তত্ত্ববিদগণ। ক্রুশাকৃতির (বর্গাকার কেন্দ্রীয় কাঠামোর চারদিকে প্রলম্বিত চারটি অভিক্ষেপ বিশিষ্ট) এই মন্দির খ্রিঃ ৭ শতকের পরে পূর্ব ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে মনে করা হয়।

মন্দির স্থাপত্যের পরিভাষা অনুসারে, এ ধরনের মন্দির সর্বোতভদ্র শৈলীর বলে চিহ্নিত করা হয়। সোমপুর মহাবিহার, শালবন বিহার, বিক্রমশীলা মহাবিহারের কেন্দ্রীয় মন্দিরের ভূমি নক্সা এই মন্দিরের অনুরূপ। পরবর্তী সময়ে এই মন্দির স্থাপত্য গঠনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ মন্দির স্থাপত্যকে প্রভাবিত করেছিল। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমদিকের সক্রিয় বদ্বীপ অঞ্চলে এটিই এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত একমাত্র সর্বোতভদ্র ধরনের মন্দির।মূল স্থাপনার চারপাশে রয়েছে ৩ মিটার প্রশস্ত প্রদক্ষিণ পথ। সাম্প্রতিক খননের ভিত্তিতে অনুমান করা যায় যে, স্থাপত্য কাঠামোটির গঠনে দুই বা ততোধিক কালপর্বে রূপান্তর ঘটেছিল। প্রথম কালপর্বের দিকে সম্ভবত প্যানেল অলঙ্করণসহ বর্গাকার একটি স্থাপত্য কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল, একদিকে একটি প্রবেশপথসহ। পরবর্তী সময়ে প্যানেলসহ বর্গাকার স্থাপত্য কাঠামোটির চারদিকে চারটি অভিক্ষেপযুক্ত করা হয়। প্যানেলসহ দেয়াল এবং পরবর্তী সময়ে সংযুক্ত অংশবিশেষ শেষপর্বে দেয়াল নির্মাণ করে ঢেকে দেয়া হয়েছিল।ভরত ভায়না নিয়ে প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর যে লিফলেট করেছে, সেখানে অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থাপনার শিরোদেশে রয়েছে একটি চতুষ্কোণাকার ইটের মঞ্চ যা ভূমি থেকে ১১.৮৮ মিটিার উঁচু। মঞ্চটি চারটি প্রকোষ্ঠের সমন্বয়ে গঠিত এবং দেয়ালগুলো ২.৮০ মিটার চওড়া। মঞ্চের ওপর ছিল উপরিকাঠামো। দেয়ালগুলো ছাড়া মূল স্থাপনার মাত্র কয়েক স্তর ইট কোন কোন স্থানে ভঙ্গুর অবস্থায় পাওয়া যায়। এছাড়া অন্যান্য বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত। ইট দিয়ে তৈরি ৯৪টি বিভিন্ন আকৃতির আবদ্ধ প্রকোষ্ঠের মাধ্যমে উঁচু পরিসরে মঞ্চসদৃশ কাঠামোটি নির্মিত হয়েছিল। আবদ্ধ প্রকোষ্ঠের মাধ্যমে একটি স্থানকে উঁচু ও দৃঢ় করে তার ওপর ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের রীতি প্রাচীন বাংলা অঞ্চলের স্থাপত্যরীতির একটি জনপ্রিয় ও তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যত্র এ ধরনের স্থাপত্য নির্মাণ কৌশল ব্যবহৃত হলেও, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্ন  স্থাপনায় (যেমন মহাস্থানের গোকুল মোড়, যশোরের দমদম পীরস্থান ঢিবি) এই কৌশলের প্রয়োগ দেখা যায়।

প্রতœতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে মানবদেহের (যেমন মাথা, বাহু, হাত ও পা এবং কাপড় ও অলঙ্কার) ও প্রাণীর দেহের (যেমন ষাঁড়ের মাথা) উপস্থাপন বিশিষ্ট পোড়ামাটির ফলকচিত্রের ভগ্নাংশ আর বিভিন্ন ধরনের অলঙ্কৃত ইট, বিভিন্ন দৈনন্দিন ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত মৃৎপাত্র ও মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ পাওয়া গেছে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ সরকারের সংরক্ষিত একটি পুরাকীর্তি। এছাড়া খননের সময় বিভিন্ন ধরনের নক্সা সংবলিত ও অলঙ্কৃত জ্যামিতিক নক্সা (যেমন কপিং, ডেন্টিং, খিলান) সংবলিত ইট পাওয়া গেছে। নক্সা সংবলিত ও অলঙ্কৃত ইটগুলো দেখে ধারণা করা হয়, স্থাপত্য কাঠামোটিতে অনেক ধরনের অলঙ্করণ ছিল। ক্রুসিফর্ম আকৃতির কাঠামোর চারদিকে ৪টি অভিক্ষেপ প্যানেল রয়েছে। প্যানেলগুলোতে সম্ভবত পোড়ামাটির ফলক লাগানো ছিল। খননের সময় পোড়ামাটির ফলকচিত্রের ভাঙ্গা অংশ পাওয়া গেছে। স্থাপত্য তৈরিতে ইট ও কাদামাটি ব্যবহার করা হয়েছে।প্রতœতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে নিত্য ব্যবহার্য মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে মৃৎপাত্রের বিভিন্ন অংশ (যেমন রিম, বড়ি, বেস ও বিভিন্ন ধরনের অলঙ্করণ)। প্রাপ্ত মৃৎপাত্রসমূহের বেশিরভাগই গামলা বা সানকি বা থালা। এ ধরনের মৃৎপাত্র বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ন  স্থানে পাওয়া গেছে।এগুলোর সময়কাল আদি মধ্যযুগের বলে পণ্ডিতগণ নির্ণয় করেছেন। এছাড়া রয়েছে হাঁড়ি, ধূপদানি, বাটি, কলস ও সংরক্ষণ পাত্র। প্রতিদিন এখানে শত শত মানুষ আসছেন এসব নিদর্শন দেখতে। করা হয়েছে আনসার ক্যাম্প। ১০টাকা ফি দিয়ে মানুষ ঢুকতে পারেন প্রাচীর দেয়া এই প্রত্ন  তাত্ত্বিক নির্দশনটি দেখতে।