সোমবার, আগস্ট ৮, ২০২২ ||

তথাগত অনলাইন |বুড্ডিস্ট নিউজ পোর্টাল

আজ শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তথা বুদ্ধ পূর্ণিমা

আজ শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তথা বুদ্ধ পূর্ণিমা। আজকের দিনটি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য এক অবিস্মরণীয় দিন।কারণ, এ তিথি ঘিরে রয়েছে তথাগত বুদ্ধের তিনটি স্মরণীয় ঘটনা। ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত এ তিথির তাৎপর্য অত্যন্ত বিশাল। সব পূর্ণিমা তিথি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য কোন না কোন গুরুত্ব বহন করে। তবে আজকের তিথির সঙ্গে রয়েছে অন্য তিথিগুলোর বিস্তর ফারাক। গভীর রাত, পুণ্যবতী মায়াদেবী রাজপালঙ্কে অঘোর নিদ্রায় মগ্ন। ঘুমন্ত অবস্থায় তিনি স্বপ্ন দেখলেন। সেদিন ছিল কপিলাবস্তু নগরীতে আষাঢ়ী পূর্ণিমার উৎসব। রানী সারাদিন উৎসবে মেতে ক্লান্ত শরীরে শেষ রাতে স্বপ্নে দেখলেন, চারদিক থেকে চার দিকপাল এসে তাকে শয্যাসহ তুলে নিলেন। চাঁদের জ্যোৎস্না ছড়ানো রমণীয় এক হ্রদে রানী দেখলেন সহস্রদল পদ্ম। লাবণ্য আর লালিমায় রক্তিম। এক সাদা হস্তী সেই হ্রদে জলকেলি করছে। হস্তীটি মায়াদেবীর আগমনে সামনে এগিয়ে এলো। একটি বর্ণময় পদ্ম মায়াদেবীর ডান কুক্ষিতে প্রবেশ করিয়ে দিল হস্তীটি। এতে রানীর দেহমনে এক অপূর্ব শিহরণ জাগ্রত হলো। মায়াদেবীর ঘুম ভেঙ্গে গেল। তিনি পালঙ্কে উঠে বসলেন। শাক্যরাজ্যের প্রাণপুরুষ রাজা শুদ্ধোধনের রাজমহিষী তিনি। এ আমি কী দেখলাম! পরদিন রানী রাজা শুদ্ধোধনের কাছে স্বপ্নের কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করলেন। রাজা কালবিলম্ব না করে জ্যোতিষীদের ডেকে পাঠালেন এবং জ্যোতিষীদের কাছ থেকে রানীর স্বপ্নের বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইলেন। জ্যোতিষীরা বললেন- মহারাজ, রানী মায়াদেবীর পুত্রসন্তান হবে। এই পুত্র মহাতেজস্বী ও যশস্বী মহাপরুষ হবেন। শান্ত, গভীর, জগতে দুর্লভ, জীবের দুঃখহারী ও মহাজ্ঞানী পুত্রের জনক হবেন আপনি। তবে এখানে নৈরাশ্য এবং বেদনার সংবাদও জড়িয়ে রয়েছে। আছে কিছু বিয়োগ-বিচ্ছেদের অশনিসঙ্কেত। রাজা শুদ্ধোধন অতলায়িত বিস্ময়ে তাকিয়ে জ্যোতিষীদের নির্দেশ করলেন ঘটনা খুলে বলার জন্য। তারা বললেন, পুত্রসন্তান লাভের সাত দিন পর মায়াদেবীর অকালমৃত্যু ঘটবে। এ মৃত্যু অমোঘ, অনিবার্য। একদিকে রাজপ্রাসাদে মহাপুরুষের আগমন সংবাদ, অপরদিকে মায়াদেবীর আসন্ন মৃত্যু সংবাদে রাজা শুদ্ধোধন বিচলিত। আসন্ন প্রসবা মায়াদেবীর রূপ যেন বাঁধ মানছে না। যেন লাবণ্য বারিধি উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে। ভূকৈলাসের রাজা আসবেন এ মর্ত্যভূমিতে। জ্যোতি রূপোজ্জ্বল। প্রাণময়ী পরামার্থা। যুগে যুগে মহাপুরুষরা এভাবেই পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন। যথাসময়ে মায়াদেবী পিত্রালয় দেবদহনগরে যাওয়ার জন্য রাজার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করলেন। মায়াদেবী দেবদহনগরের রাজা সূত্রবুদ্ধের জ্যেষ্ঠ কন্যা। এলো বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। ইতোপূর্বে রাজা, রানীর বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য সব ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করে রেখেছিলেন।নির্দিষ্ট দিনে সন্তানসম্ভবা মায়াদেবী সখীদলসহ রথে চড়ে বাপের বাড়ির দিকে যাত্রা শুরু করলেন। মুখে তাঁর অপরূপ লাবণ্য, বেদনা, করুণা আর ধৃতির ¯িœগ্ধতা। তিনি হবেন আলোকসুন্দর দিব্য পুরুষের জন্মদাত্রী। সৃষ্টির পূর্ণতা ও অনুপম সৌন্দর্যে সমুজ্জ্বল। বাপের বাড়ি যাওয়ার পথে লুম্বিনী কাননে পৌঁছামাত্রই মায়াদেবীর প্রসববেদনা শুরু হলো। এক পদ্ম-পলাশ-লোচন ব্রহ্মযোগযুক্ত আত্মভোলা শিশু জগতের ভাবী বুদ্ধের জন্ম হলো। লুম্বিনী উদ্যান হয়ে উঠল সৃষ্টির উৎসারিত আলোক সমুদ্র। পূর্ণতার পরমতম আকর্ষণ। মায়াদেবী উদাসীন অথচ আনন্দময়ী, জগজ্জননী জ্যোর্তিময়ী। মহাসমারোহে শোভাযাত্রাসহকারে মাতা ও তেজস্বী নবজাতককে লুম্বিনীকাকন থেকে কপিলাবস্তু নগরের রাজপ্রাসাদে ফিরিয়ে আনা হলো। এইদিনে গয়ার বোধিগাছ, রাহুলমাতা গোপাদেবী, চার নিধিকুম্ভ, চার মঙ্গল হস্তী, সারথি ছন্দক এবং অমাত্যপুত্র উদায়ীও জন্মগ্রহণ করেন। মহাপুরুষ গৌতমের সঙ্গে তারা প্রত্যেকে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। সেই দিনটি ছিল আজকের বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। দিব্যজ্ঞানস্বরূপ সাধনাসম্ভূত জ্যোতির্ময় পুরুষের জন্মের সাতদিন পর মায়াদেবীর অকালমৃত্যু হয়। মায়াদেবীর মৃত্যুতে রাজ্যময় নেমে এলো শোক। সেই প্রাচীনকালে রাজাদের মধ্যে বহুবিবাহ প্রথা চালু ছিল বিধায় রাজাশুদ্ধোধনেরও একাধিক মহিষী ছিলেন। এর মধ্যে মনোমাধুরী মায়াদেবীই ছিলেন রাজার প্রধান পতœী। রাজা তার অপর স্ত্রী গৌতমীকে সিদ্ধার্থের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ জানালেন। গৌতমীও বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে সিদ্ধার্থের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। ফলে, বিমাতা গৌতমীর অশেষ ¯েœহপরশে সিদ্ধার্থের শৈশব কাটতে লাগল। রাজকুমার সিদ্ধার্থ এখন পূর্ণ কিশোর, শান্ত মূর্তি। রাজা শুদ্ধোধন পুত্রের শিক্ষার কথা ভাবতে লাগলেন। সর্বোচ্চ এবং সর্বপ্রকার শিক্ষার জন্য শাক্যরাজের প-িতপ্রধান বিশ্বামিত্রকে নিযুক্ত করলেন। পরে এক শুভদিনে প-িতপ্রধান বিশ্বামিত্র রাজকুমারকে রাজা শুদ্ধোধনের কাছে এনে বললেন, রাজমহাশয় রাজকুমারের শিক্ষা শেষ। আমার কাছে তাকে দেয়ার মতো আর কোন কিছু অবশিষ্ট নেই। রাজকুমার দৈনিক শিক্ষায়তনেও মেধার বিকাশ ঘটালেন খুব অল্পসময়ে। তার আর কোন শিক্ষা বাকি নেই। সব বিদ্যায় পারদর্শী রাজকুমার। রাজপুত্রের উদাসীনতা কাটাতে নানা প্রচেষ্টা চালিয়েও রাজা সফলকাম হতে পারলেন না। একদিন তিনি রাজ্যে রথ প্রতিযোগিতার আয়োজন করলেন শুধু সিদ্ধার্থকে ফেরাতে। প্রতিযোগীরা হলেন- নন্দ, আনন্দ, দেবদত্ত এবং রাজপুত্র সিদ্ধার্থ। ঘোষণা করা হলো- প্রতিযোগিতায় যে প্রথম হবে তাকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হবে। যথারীতি প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। রথে ঘোড়া সংযোজন করল চার প্রতিযোগী। তারপর শুরু হলো যাত্রা। প্রথমে ধীর-মন্দগতিতে, পরে দ্রুত, আরও দ্রুত, ক্ষিপ্রগতিতে এবং সর্বশেষ উল্কাগতি। পলকে পলকে দৃশ্য পাল্টে যেতে লাগল। রাজকুমার চোখের পলকে শাক্যরাজ্য অতিক্রম করে চলে এলেন। পেছনে, অনেক পেছনে নন্দ, আনন্দ এবং দেবদত্ত। প্রতিযোগিতায় রাজকুমার সিদ্ধার্থ প্রথম হলেন। তাঁকে বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করা হলো রাজার ঘোষণা অনুযায়ী। এতে রাজার আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হলো। রাজপ্রাসাদের কুলললনারা ও সমবেত জনতা আনন্দ ধ্বনিতে সিদ্ধার্থকে জয়মাল্যে ভূষিত করে রাজপ্রাসাদে নিয়ে এলো। সিদ্ধার্থ জয়ী, প্রতিযোগিতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু এ প্রতিযোগিতায় তাঁর কোন আগ্রহ নেই, নেই কোন আনন্দ। তবু এ কাজ কর্তব্যবোধেই তিনি করলেন। এ তার কর্তব্য, পিতৃআজ্ঞা পালন।অতি সংক্ষেপে লিখলাম ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত ঘটনা। কুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করে কঠোর সাধনা এবং তপস্যার মাধ্যমে যেদিন বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন সেদিনও ছিল আজকের বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। বুদ্ধত্ব লাভের পর বৌদ্ধধর্ম প্রচার করে যেদিন তিনি মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন, সেদিনও ছিল আজকের বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। সবাইকে বুদ্ধ পূর্ণিমা তথা বৈশাখী পূর্ণিমার লালগোলাপ শুভেচ্ছা। সকলের জীবন অনাবিল আনন্দে ভরে উঠুক। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। লেখক : সাংবাদিক

তথাগত: অন্য চোখে

তুমি এই পৃথিবীর মানুষের জীবন্ত প্রতীক তবু কত বিতর্কের বেড়াজাল নিয়ে ঘিরেছি তোমায়, ঢেকেছি ধর্মের আবরণে। আমাদের চোখে তুমি তথাগত বুদ্ধ চীবর পরা শাস্ত সৌম্য এক মহাভিক্ষু নতুন পথের এক স্রষ্টা সুমহান। হে মহাপ্রাণ, তুমি কি চেয়েছিলে এমন একা আবছায়া সাজ!গড়ে তোলা স্বর্গ ব্যবধান তোমার আর আমাদের মাঝে আমি জানি— তুমি তা চাওনি কোনো দিন। তুমি দেখতে চাওনি ধর্মের নামে অলৌকিক খেলা! মোহের আবেশে বাঁধতে চাওনি দুর্বল মন তুমি স্পষ্ট করে বলেছিলে— আছে দুঃখ, আছে জরা, আছে মৃত্যু জগতের সেই তো নিয়ম। তাই তুমি বিপন্নের শত অনুনয়ে মৃতকে দাওনি জীবন, অসুস্থকে সুস্থ করে দেখাওনি বৈদ্যিক প্রতিভা গরীবের শূন্য ঘর ভরে দাওনি ধনে দৌলতে। তুমি চেয়েছিলে ভিতরে বাইরে মানুষ স্পষ্ট করে জানুক নিজেকে গ্রহণ করুক জীবনের রুঢ় বাস্তব। পায়ে পথে বাধা ঠেলা চলতে শিখুক সুকঠিন এ মাটির পথে। রাজার বৈভব ছেড়ে ভিক্ষা-পাত্র হাতে এ সংসারে তুমিই প্রথম দেখিয়েছ ত্যাগের মহিমা।তুমি চেয়েছিলে এক আদর্শ দেশ যেখানে সবাই হবে রাজা। না, এ তোমার অলীক কল্পনা নয় এই সত্য, এই তো ঘটনা হ্যাঁ, আমরা তা পারি আমরা সবাই রাজা হতে পারি সম্পদ বৈভবে নয়, মনের ঐশ্বর্যে। মহামারী দুর্ভিক্ষের কালে তাই কোনো শ্রেষ্ঠী নয়- তোমার আহ্বানেসাড়া দেয় ভিক্ষুণী অন্ন দিতে নিরন্নের মুখে তোমারি দীক্ষা-দীপ্ত ভিক্ষু আনন্দ নির্দ্বিধায় করে পান চণ্ডালিনীর জল। পতিতা আম্রপালি তোমারই ছোঁয়ায় পায় মানবীর মান। সব মানুষের আগে বুঝেছিলে তুমি এ জগতে সবাই সমান এর চেয়ে বড় সাম্যবাদ আর কোথাও ভাবেনি তো কেউ এর চেয়ে বড় বিপ্লব আর কোথাও ঘটেনি কখনো।হে বিপ্লবী বুদ্ধ তোমার মতন আমরা পারিনি সব দুঃখ সহ্য করে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে সকলের তরে। তোমায় রেখেছি তাই পাথরের মূর্তি গড়ে, বন্দি করে মন্দিরের নিরন্ধ্র নির্জনে। শুধু মাঝে মাঝে বিশেষ দিনে ফুল চড়াই তোমার মূর্তিতে, ধূপ জ্বালাই, বাতিও মানি না পঞ্চশীল। চলি না অষ্টমার্গে।তোমার অস্তিত্ব আজ বিপন্ন আমাদেরই হাতে।

মাঘী পূর্ণিমা এক অবিস্মরণীয় দিন

আজ শুভ মাঘী পূর্ণিমা। আজকের মঙ্গলময় পুণ্য তিথিতে মহামানব বুদ্ধ নিজের আয়ু সংস্কার পরিত্যাগ করেছিলেন।বুদ্ধের প্রধান সেবক আনন্দকে বুদ্ধ বললেন, ‘আনন্দ- এ বৈশালী অত্যন্ত মনোরম স্থান।’ এখানকার উদ্যান চৈত্য, গৌতম চৈত্য, বহু পুত্রক চৈত্য বড়ই মনোরম ও মনোমুগ্ধকর স্থান। প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি যেমন চমৎকার, তেমনি প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদেও এসব এলাকা ভরপুর। বুদ্ধ আবার বললেন, ‘আনন্দ তথাগত ইচ্ছা করলে কল্পকাল স্বকীয় ঋদ্ধিবলে বর্তমান দেহ অবস্থান করতে পারেন।’ হে আনন্দ, তথাগতের চারি ঋদ্ধি পাদ ভাবিত, বহুলীকৃত রথগতি সদৃশ অনর্গল অভ্যস্ত, বাস্তুভূমি সদৃশ, সুপ্রতিষ্ঠিত, পরিচিত, সম্যকভাবে আপনার করায়ত্ত। আনন্দ, সেজন্য তথাগত ইচ্ছা করলে কল্পকাল কিংবা কল্পের অবশিষ্ট সময় অবস্থান করতে পারেন।তথাগত বুদ্ধ কী বোঝাতে চাইলেন আনন্দ তা অনুধাবন করতে পারল না মারের দ্বারা প্রলুব্ধ হওয়ায়। কিন্তু মার বিরামহীনভাবে বুদ্ধকে শুধু একটি কথাই বারবার বলেছেনÑ ‘হে সুগত, আপনি পরিনির্বাণপ্রাপ্ত হোন, আপনার পরিনির্বাণপ্রাপ্ত হওয়ার এখনই সঠিক সময়। ভগবান মারকে বললেন, হে পাপি মার যত দিন আমার ভিক্ষুসংঘ ত্রিপিটকের বাণীসমূহ সুন্দররূপে ব্যাখ্যা করতে পারবেন না, তত দিন পর্যন্ত তথাগত নির্বাণ লাভ করতে পারেন না। মার বলল, ‘ভন্তে ভগবান, আপনার ভিক্ষুসংঘ এখন ধর্ম প্রচারে সিদ্ধহস্ত ও নিপুণ। সুতরাং ভন্তে ভগবান আপনি নিবিগ্নে নির্বাণ লাভ করতে পারেন। পাপমতি মারকে ভগবান বললেন, হে পাপিষ্ঠা দুরাচার মার তাহলে শোন, অচিরেই তথাগত পরিনির্বাণপ্রাপ্ত হবেন। এখানে উল্লেখ্য যে, তথাগত ভগবান বুদ্ধ তখনকার সময়ে যখন আশি বছর বয়সে পদার্পণ করেন, তখন রাজগৃহের বেলুরবনে পঁয়তাল্লিশ বর্ষা অর্থাৎ অন্তিম বর্ষা অধিষ্ঠান করেছিলেন। তিনি বর্ষাব্রতকালীন কঠিন রোগে আক্রান্ত হন। একমাত্র প্রবল ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগে সাধনা দ্বারা রোগমুক্ত হয়েছিলেন। যাকে ছন্দ, বীর্য, চিত্ত মীমাংসা বলা হয়। ভগবান চাপাল চৈত্যে সেই সময় আজকের মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে স্মৃতিমান ও সচেতন অবস্থায় স্বীয় আয়ু সংস্কার পরিত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে এই বলে ঘোষণা দিলেন, এখন থেকে তিন মাস পর বৈশাখী পূর্ণিমা পর্যন্ত আমার প্রাণবায়ু চলতে থাকুক, সজীব থাকুক, সচেতন থাকুক, অতঃপর নিরুদ্ধ হয়ে যাক। বুদ্ধ এ সংকল্প গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রবলভাবে ভূকম্পন শুরু হয়। মুহুর্মুহু প্রলয়দেব গর্জন করতে থাকে। এই ভূকম্পনে আনন্দ বেশ ভয় পেয়ে গেলেন। এর হেতু কী জানতে আনন্দ দ্রুতগতিতে বুদ্ধের কাছে ছুটে যান এবং ভূকম্পনের কারণ জানতে চান। বুদ্ধ আনন্দকে বললেন, ‘শোন আনন্দ, বোধিসত্ত্ব যখন মাতৃজঠর থেকে ভূমিষ্ঠ হন, তখন তার পুণ্যতেজে ভূকম্পন হয়, যখন বোধিসত্ত্ব সম্বোধি জ্ঞান লাভ করেন তার তেজে ভূকম্পন হয়, বুদ্ধেও প্রবর্তনকালে একবিংশ ভূমির প্রাণীগণের সাধুবাদ ধ্বনিতে ভূকম্পন হয়, আর যখন তথাগত আয়ু সংস্কার পরিত্যাগ করেন, তখন পৃথিবী কারুণ্যে কম্পিত হয়। তিনি যখন নির্বাণ লাভ করেন, তখন পৃথিবী রোধন ধ্বনিতে কম্পিত হয়ে থাকে। হে আনন্দ, আমি সম্বোধি লাভের অষ্টম সপ্তাহে উরুবিল্ল গ্রামের অজপাল নিগ্রোধমূলে উপবিষ্ট ছিলাম। সে সময় পাপমতি মার এসে আমাকে বলল, ‘হে ভগবান, আপনি এখন পরিনির্বাণ লাভ করেন। আপনার এখন পরিনির্বাণ লাভের উপযুক্ত সময়।’ তখন আমি মারকে বলেছি, যত দিন আমার ভিক্ষু-ভিক্ষুনি, দায়ক-দায়িকা, উপাসক-উপাসিকারা যথার্থ ধর্মবেত্তা বিনীত বিশুদ্ধ জীবনযাপনের যোগ্যতা অর্জন না করে, যত দিন তারা সদ্ধার্মর ব্যাখ্যা ও বিস্তার করতে না পারেন, যত দিন আমার সদ্ধর্ম প্রভাবশালী ও বর্ধনশীল না হয়ে জনসাধারণের কাছে প্রকাশ ও তাদের দ্বারা অভিনন্দিত ও পরিগৃহীত না হয়, তত দিন পর্যন্ত আমি নির্বাণ লাভ করতে পারি না। হে আনন্দ, অদ্য সেই পাপমতি মার চাপাল সেজে আমার কাছে এসে আমাকে পরিনির্বাণের আবেদন জানায়। মারের প্রশ্নের উত্তরে আমি যা তাকে বলেছি তাতে সে সন্তুষ্ট হতে পারল না। মার আমাকে বলল, ভান্তে ভগবান, আপনার জীবনের ব্রত সমাপ্ত হয়েছে। আপনার দায়ক-দায়িকারা সবাই আপনার অতীত ধর্ম উপলব্ধি করেছে। আপনার প্রচারিত ধর্ম দেব-মনুষ্য সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং আপনি এখন পরিনির্বাণপ্রাপ্ত হতে পারেন। হে আনন্দ, তখন আমি মারকে বলেছিÑ হে পাপমতি মার তুমি শোনে খুশি হও, তথাগত আজ থেকে তিন মাস পর পরিনির্বাণ লাভ করবেন। হে আনন্দ, আজ মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে বৈশালীর চাপাল চৈত্যে তথাগত কর্তৃক আপন আয়ু সংস্কার জেনে-শোনে পরিত্যক্ত হয়েছে। আনন্দ বুদ্ধের মুখে এ কথা শোনে শোকে কাতরকণ্ঠে বললেন, ‘ভন্তে ভগবান, কল্পকাল এ দেহে অবস্থান করুন। হে সুগত, বহুজনের সুখের জন্য, দেব-মনুষ্যগণের ঐহিক পারত্রিক হিত সুখ কামনায় কল্পকাল এ দেহে অবস্থান করুন। তথাগত আনন্দকে বললেন, হে আনন্দÑ তুমি বৃথা ক্রন্দন করো না, আর কোনো আবেদনও জানিও না। কারণ এতে কোনো ফল লাভ হবে না। ভুল তুমি আগেই করেছো, এটি তোমার মারাত্মক অপরাধ। কারণ আমি তোমাকে আকার-ইঙ্গিতে এ কথা বোঝাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় হলো, আমি যা তোমাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম তুমি তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারোনি। এর আগে আমি তোমাকে যেখানে-যেখানে বারবার ইঙ্গিত দিয়েছিলাম, সে জায়গাগুলো হলোÑ রাজগৃহের গৃধ্রকূট পর্বত, রাজগৃহের গৌতম ন্যাগ্রোধমূলে, রাজগৃহের চৌরপ্রপাতে বেভার পর্বতে, সপ্তপর্ণী গুহায়, ঋষিগিলি পর্বতে, কালশীলায়, শীতবনে, সর্প সোন্ডিক গুহায়, তপোদারামে, বেণুবনে, কলন্দক নিবানে, জীবক আম্রবনে, মদ্রকুক্ষিতে ও মৃগদাবে। এসব স্থানের কোনোখানে একবারও তুমি আমার ইঙ্গিতের মর্ম বুঝতে পারোনি এবং এ দেহে কল্পকাল অবস্থানের নিমিত্তে প্রার্থনাও করোনি। ভগবান শোকগ্রস্ত আনন্দকে বললেন, ‘হে আনন্দ আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি, আমাদের সব প্রিয় ও মনোহর বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে, তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক রাখা যাবে না। হে আনন্দ, তথাগত যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, তার অন্যথা কোনো অবস্থাতেই হবে না, এজন্য দুঃখ করো না, এতে মনের যাতনা বাড়তে থাকবে। শান্ত হও, জীবের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করো।’ভিক্ষুদের উদ্দেশে ভগবান বললেন, হে ভিক্ষুরাÑ আমি তোমাদের অভিজ্ঞাবলে যে ধর্মসমূহ উপদেশ দিয়েছি, সেগুলো তোমরা উত্তমরূপে আয়ত্ত করো এবং নিখুঁতভাবে আচরণ করো। সেসব বিষয় গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করো এবং এসব বিষয় সর্বত্র প্রচার করো। এই নিষ্কলুষমূলক ধর্ম যাতে চিরকাল স্থায়ী হতে পারে এবং এ কারণে সব মহলে মঙ্গল হয়, সে মোতাবেক নিজেদের পরিচালিত করবে। এতে প্রাণিজগতের প্রতি অনুকম্পা ও দেব-মনুষ্যগণের হিতসুখ অনন্তকাল অটুট থাকবে। হে ভিক্ষুরা, তোমরা জেনে রেখোÑ সংস্কারসমূহ খয়শীল, অপ্রমদের সহিত নির্বাণ সাধনায়ব্রতী হও। অচিরেই তথাগত পরিনির্বাণ লাভ করবেন। অর্থাৎ আজ থেকে তিন মাস পর বৈশাখী পূর্ণিমায় কুশীনগরের মল্লদের শালবনে তথাগত পরিনির্বাণপ্রাপ্ত হবেন। আজ দিনের কার্যসূচি শুরু হয়েছে ভোররাতে বিশ্বশান্তি কামনায় বিশেষ সূত্রপাঠের মাধ্যমে প্রতিটি বিহার থেকে। আজকের মাঘী পূর্ণিমা তিথিটা এমন সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশসহ বিশ্ব এক মহাসংকটময় কাল অতিক্রম করছে। তবে বাংলাদেশের জনগণ সুখে দিনযাপনে অন্যান্য দেশের জনগণের চেয়ে অধিক গুণ এগিয়ে আছে। বৌদ্ধ সম্প্রদায় আজ সারা দিন ধর্মীয় আবেসে পুলকিত থাকবেন। ধর্মীয় কার্যাদি এবং বুদ্ধপূজা উৎসর্গের পর বিকেলে প্রতিটি বিহারে ধর্মীয় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আজকের দিনের তাৎপর্য তুলে ধরে প্রাজ্ঞ ভিক্ষুসংঘসহ দায়ক-দায়িকারা অংশগ্রহণ করবেন। সন্ধ্যা তথা রাতে সম্মিলিত ধর্মীয় প্রার্থনার পর দিনের কার্যসূচির পরিসমাপ্তি ঘটবে। আজকের শুভ মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে সেই অতীতকালের কথাই স্মরণে আসছে। বুদ্ধ কালোগত হওয়ার আগে বুদ্ধের সঙ্গে মারের যেই কথা হয়েছিল, সেগুলো বুদ্ধ আনন্দের কাছে ইঙ্গিতে ব্যক্ত করা সত্ত্বেও আনন্দ বুঝতে পারেনি। এ ঘটনাবলিতে আমাদের জন্য শিখার অনেক কিছু আছে। বুদ্ধ সুনির্দিষ্ট পথ কিন্তু আমাদের জন্য সৃষ্টি করে দিয়েছেন। নিজের কর্মগুণেই সৎপথ পাওয়া যাবে। এতে কারো সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন হবে না। নিজের জ্ঞানবলে এবং মানব কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারলে দুঃখনামক জীবনটা অপসারিত হয়ে সুখপাখী হাতের কবজায় চলে আসবে আপনা-আপনি। বুদ্ধ নির্দেশিত সব বাণী মানবের জন্য খুবই মঙ্গলদায়ক। তাই বলছিলাম, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে যার ধর্ম পালনে নিবিষ্ট হতে পারলে দেশ অচিরেই সমৃদ্ধি লাভ করবে। আজকের শুভ মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে সবাইকে জানাই লালগোলাপ শুভেচ্ছা। জগতের সব প্রাণী সুখী হোক।লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট shatadal.barua@yahoo.com
ত্রিপিটকে কয়টি গ্রন্থ ও কি কি?

ত্রিপিটকে কয়টি গ্রন্থ ও কি কি?

ত্রিপিটক প্রধানতঃ তিনটি ভাগে বিভক্ত। ১. বিনয় পিটক, ২. সূত্র পিটক, ও ৩. অভিধর্ম পিটক। বিনয় বুদ্ধ শাসনের আয়ু সদৃশ। অর্থকথায় উল্লেখ হয়েছে সুত্র ও অভিধর্ম পিটক বিলুপ্ত হলেও যদি বিনয় প্রতিপালিত হয় তবে বুদ্ধের ধর্মের বিলুপ্তি ঘটবে না। ব্রহ্মচর্য জীবনের বিশুদ্ধিতা ও স্থায়িত্বের জন্য বিনয় বুদ্ধ কতৃক প্রবর্তিত হয়েছে। এবং বিনয়গুলো একসাথে প্রবর্তন করা হয় নি। উপযুক্ত কারণ ও অবস্থার প্রেক্ষিতে এগুলো প্রবর্তন করেন বুদ্ধ। এই বিনয় ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের মাঝে শৃঙ্খলা, সৌহার্দ্য, প্রীতি, ভ্রাতা-ভগ্নি বন্ধন, নিয়মানুবর্তিতা, সংযম, চরিত্রবল, শীলের প্রতি গারবতা আনয়ন, সমাধিতে নিমগ্ন হওয়া তথা দুঃখ মুক্তির পথ বিনির্মাণে অপরিহার্য। 
বিনয় পিটক বই পাঁচটি, সূত্র বিভঙ্গ-১. পারাজিকা, ২. পাচিত্তিয়; খন্ধক-৩.মহাবর্গ. ৪. চুল্লবর্গ, ও ৫.পরিবার পাঠো। বিনয় পিটকের অর্থকথা হলো সামান্তাপাসাদিকা ও রচয়িতা হলেন আচার্য বুুদ্ধঘোষ।এখানে পরিবার পাঠে অপর চারটি বিষয়ের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে এবং কিছু দুরুহ বিষয় মীমাংসার নির্দেশনা আছে। সর্বমোট বিনয় শীলের সংখ্যা হল সতের হাজার কোটি পঞ্চাশ লক্ষ ছত্রিশটি। 
 ত্রিপিটকের সূত্র পিটক হলো বুদ্ধের মূলোপদেশের বিন্যাস। এখানে পাঁচটি নিকায় বা ভাগ বিদ্যমান।  প্রথম চারটি নিকায় বুদ্ধের উপদেশের প্রাচীনত্ব দাবী করে বলে পন্ডিতদের অভিমত। 
১.দীর্ঘনিকায়- অর্থকথা- সুমঙ্গল বিলাসিনী, রচয়িতা, আচার্য বুদ্ধঘোষ। দীর্ঘনিকায়ে মোট ৩৪ টি দীর্ঘ সূত্র আছে। 
২. মধ্যম নিকায়- অর্থকথা- প্রপঞ্চসূদনী, রচয়িতা, আচার্য বুদ্ধঘোষ। মধ্যম নিকায় ১৫২ টি সূত্র নিয়ে গঠিত। 
৩.সংযুক্ত নিকায়, অর্থকথা, সারার্থ প্রকাশনী, রচয়িতা, আচার্য বুদ্ধঘোষ। এতে ৭৭৬২ টি সূত্র বিদ্যমান।  
৪. অঙ্গুত্তর নিকায়-অর্থকথা- মনোরথ পূরণী, রচয়িতা, আচার্য বুদ্ধঘোষ। এতে ৯৫৫৭ টি সূত্র বিদ্যমান। 
৫. খুদ্দক নিকায়, এই নিকায়ে সর্বমোট পনেরটি গ্রন্থ- 
১. খুদ্দকপাঠো, অর্থকথা, পরমার্থজ্যোতিকা, রচয়িতা, আচার্য বুদ্ধঘোষ। এটিতে শরণগমন, দশশিক্ষাপদ, বত্রিশ অশুচি পদার্থের বিশ্লেষণ, মঙ্গল, রতন প্রভৃতি সূত্র বিদ্যমান। 
২. ধর্মপদ, অর্থকথা, ধর্মপদর্থকথা, রচয়িতা, আচার্য বুদ্ধঘোষ। এটিতে ৪২৫ টি গাথা বিদ্যমান। 
৩. উদান, পরমার্থদীপনী, আচার্য ধর্মপাল। এটিতে ৮২ টি বুদ্ধ ভাষিত আনন্দ প্রকাশক সংক্ষিপ্ত গাথা আছে। ৪. ইতিবুত্তক,  অর্থকথা ও রচয়িতা পূর্বোক্ত। এতে ১১০ টি সংক্ষিপ্ত ধর্মালোচনা বিদ্যমান। 
৫.সূত্রনিপাত-পরমার্থজ্যোতিকা, আচার্য বুদ্ধঘোষ। এটি ৭০ টি উৎকৃষ্ট উপদেশের সমষ্টি। 
৬.বিমানবস্তু-পরমার্থদীপনী-আচার্য ধর্মপাল। এটিতে দেবলোকে দেবতাদের সুখ বিষয়ক বর্ণনা। 
৭. প্রেতবস্তু, এটিতে প্রেতলোকের দুঃখ বিষয়ক বর্ণনা বিদ্যমান। 
৮. থেরগাথা, এটিতে ১০৭ জন অরহৎ স্থবিরের বুদ্ধ ভক্তিমূলক গাথা ও তাঁদের সংক্ষিপ্ত জীবনেতিহাস। 
৯. থেরীগাথা- ৭০ জন অরহৎ ভিক্ষুণীর বুদ্ধ ভক্তিমূলক গাথা ও তাঁদের সংক্ষিপ্ত জীবনেতিহাস।  এই তিনটির অর্থকথা ও রচয়িতাও হলেন পরমার্থদীপনী , আচার্য ধর্মপাল। 
১০. জাতক, অর্থকথা, জাতকার্থকথা, রচয়িতা আচার্য বুদ্ধঘোষ। এটিতে বুদ্ধের পূর্বজন্মের ৫৫০ জন্মের কাহিনী বিবৃত হয়েছে। 
১১. নির্দেশ, অর্থকথা, সদ্ধর্মপ্রজ্যোতিকা, রচয়িতা আচার্য উপসেন, এটি সুত্র নিপাতের বিস্তৃত ব্যাখ্যা। 
১২. প্রতিমম্ভিদামার্গ, অর্থকথা, সদ্ধর্মপ্রকাশনী, রচয়িতা আচার্য মহানাম; এটিতে অরহৎগণের জ্ঞানের গভীর বিষয় আলোচিত হয়েছে। 
১৩. অপাদান, অর্থকথা, বিশুদ্ধজন বিলাসিনী, রচয়িতা, অজ্ঞাত; এটি বিভিন্ন অরহৎগণের পূর্বজীবনী বিষয়ক।
১৪.বুদ্ধবংশ, অর্থকথা, মধুুরার্থ বিলাসিনী, রচয়িতা আচার্য বুদ্ধদত্ত। এটিতে গৌতম বুদ্ধের পূর্ববর্তী ২৪ জন বুদ্ধের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিপিবদ্ধ হয়েছে। 
১৫. চরিয়াপিটক, পরমার্থদীপনী-আচার্য ধর্মপাল।
 এটিতে বুদ্ধের অতীত ৩৪ জন্মের ঘটনাবলী পদ্যছন্দে বিবৃত হয়েছে। উল্লেখ্য, মিলিন্দ প্রশ্ন- সুত্তানূলোম, সূত্রকে অনুসরণকারী।  নেত্তিপ্রকরণ ও পেটকোপদেশ, পশ্চাৎপিটক (মহাকচ্চায়ন থের) এই দুটি বই মায়ানমারে ত্রিপিটকের খুদ্দক নিকায়ে সংযুক্ত হয়েছে।
অভিধর্ম পিটকে সাতটি বই- 
১ ধর্মসঙ্গনী- এটিকে সমগ্র অভিধর্মের বিশুদ্ধ সার সংক্ষেপ বলা হয়। চিত্তের উৎপত্তি বিভাগ, রূপ বিভাগ, নিক্ষেপ বিভাগ(সমগ্র ধর্মসঙ্গনীর সারাংশ) ও অর্থকথা খন্ড এবং এতে ১৪ টি বিভাগ আছে। এটির অর্থকথা হল অর্থশালিনী, রচয়িতা, আচার্য বুদ্ধঘোষ। 
২.বিভঙ্গ, অর্থকথা, সম্মোহবিনোদিনী, রচয়িতা, আচার্য বুদ্ধঘোষ; এতে ১৮ টি পরিচ্ছদ এবং পঞ্চস্কন্ধ, দ্বাদশ আয়তন ও অষ্টাদশ ধাতুসহ বিবিধ বিষয় আলোচিত হয়েছে। 
৩. ধাতুকথা- ১৮ প্রকার ধাতু বিষয়ক বিশদ বর্ণনা আছে। 
৪. পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তি- ব্যক্তি চরিত্রের সরূপ এতে তুলে ধরা হয়েছে। 
৫.কথাবত্থু- এটি তৃতীয় সংগীতি সময়কালে সংগীতি প্রধান মোগ্গগলীপুত্ততিষ্য থের রচনা করেন, যাতে ১০০০টি বিষয়ে আলোকপাত করে বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদ খন্ডন করা হয়। 
৬. যমক- ধর্মের সুক্ষèতত্ত্ব বিবৃত হয়েছে। এবং 
৭. পট্ঠান, কার্যকারণের হেতুপ্রত্যয় বিষয়ক আলোচনা বর্ণিত। এই পাঁচটির অর্থকথা হল প্রপঞ্চপ্রকরণর্থকথা ও রচয়িতা হলেন আচার্য বুদ্ধঘোষ।
তথ্যঋণ:-
১.পালি সাহিত্যের ইতিহাস- ড.রবীন্দ্র বিজয় বড়ুয়া
২.সদ্ধর্ম রত্নচৈত্য- জিনবংশ মহাস্থবির।

দেশের সর্ববৃহৎ বিশ্ব শান্তি প্যাগোডা নির্মিত হচ্ছে রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারে

বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ প্যাগোডা নির্মিত হচ্ছে পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে। এটি জেলার শহরের রাজবন বিহারে গড়ে উঠছে। এটির নামকরণ করা হয়েছে, রাজবন বিহার বিশ্ব শান্তি প্যাগোডা। তিন পার্বত্য জেলার অভিজ্ঞ প্রকৌশলী দ্বারা এবং পুণ্যার্থীদের দানের টাকায় এটি নির্মিত হচ্ছে। প্যাগোডাটির নিমার্ণ কাজ শেষ হলে বৌদ্ধ বিশ্বে সুউচ্চ তালিকায় স্থান করে নেবে বলে জানিয়েছে রাজবন বিহার কমিটি। রাজবন বিহার কমিটির সূত্রে জানা গেছে, বৌদ্ধ বিশ্বে সর্ববৃহৎ প্যাগোডার স্থানটি দখল করে আছে থাইল্যান্ডের নাক্রন পাথম প্যাগোডাটি। যার উচ্চতা ১২০ মিটার। এরপরের স্থানটি দখল করে আছে মিয়ানমারের শোয়েডাগন প্যাগোডাটি। যার উচ্চতা ১০৮ মিটার। এর পরেরটি নির্মাণ হচ্ছে বাংলাদেশের রাঙ্গামাটিতে। যার দৈর্ঘ্য ৭০ মিটার, প্রস্থ ৭০ মিটার এবং উচ্চতা ১০৬ মিটার। বাংলাদেশের এত বড় বৌদ্ধ প্যাগোডা এখনো পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি এটি হবে দেশের সর্বপ্রথম। সূত্রে আরও জানা গেছে, প্যাগোডার নিচের তলায় থাকবে ৪টি বুদ্ধমূর্তি। এ মূর্তিগুলো হচ্ছে গৌতম বুদ্ধ, ককুসন্ধ, কোনাগমন, বুদ্ধ এবং কশ্যপ বুদ্ধের মূর্তি। এ তলাটি ভাবনা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এতে প্রায় ২ হাজারেরও অধিক মানুষ ভাবনায় বসতে পারবেন। দ্বিতীয় তলায় বাইরে থাকবে ৫০ ফুট উচ্চতা একটি বুদ্ধমূর্তি। এ তলায় গৌতম বুদ্ধের ধাতু এবং বনভান্তের মমি সংরক্ষিত থাকবে বলে জানিয়েছে বিহার কর্তৃপক্ষ। প্রধান প্রকৌশলী তৃপ্তি শংকর চাকমা জানান, আধুনিক প্রযুক্তির নির্মাণ সামগ্রী আর শতভাগ গুণগতমান সম্পন্ন কাঁচামাল ব্যবহার করা হচ্ছে এ প্যাগোডায়। অন্যান্য বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারী প্রকৌশলীরা প্রতিনিয়ত সহযোগিতা করছেন। বনভান্তের অন্যতম শিষ্য ভদন্ত বিমলানন্দ মহাস্থবির জানান, প্যাগোডাটি নির্মাণ হলে শুধু রাঙ্গামাটির নাম নয় পুরো বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল হবে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ প্যাগোডাটি দেখতে আসবে। অনেকে প্রকৌশলীদের পরামর্শ নিয়ে নির্মাণ সামগ্রী কিনে দান করছেন আবার কেউ কেউ অর্থও দান করছেন। সম্পূর্ণ দানের টাকায় এ প্যাগোডাটি নির্মিত হচ্ছে। সুত্র- মানবকন্ঠ

খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ির শান্তিপুর অরণ্য কুঠির

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শহর হিসেবে খ্যাত খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ির গভীর অরণ্যে প্রায় ৬৫ একর জায়গা জুড়ে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থান শান্তিপুর অরণ্য কুঠির অবস্থিত। নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশে ভিক্ষুদের ধ্যান করার সুবিধার্থে এখানে ১৯৯৯ সালে অধ্যক্ষ ভান্তে ভদন্ত শাসনরক্ষিত মহাথেরো এই কুঠির স্থাপন করেছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বৌদ্ধ মূর্তিই হলো এই শান্তিপুর অরণ্য অরণ্য কুঠিরের প্রধান আকর্ষণ। ৫০ ফুট বিশিষ্ট নান্দনিক এই বুদ্ধ মূর্তি নির্মাণে সময় লেগেছে প্রায় ৪ বছরের মতো। ছোট ছোট টিলা এবং পাহাড়ি গাছ-গাছালি দিয়ে ঘেরা এই কুঠিরে রয়েছে সুবিশাল মাঠ, দুইটি কৃত্রিম হ্রদ, অনুষ্ঠান মঞ্চ, ছোট্ট বেড়ার ঘর ও রয়েছে ভক্তদের উপাসনার বাতিঘর। কুঠিরের চারপাশে লাগানো রয়েছে প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন বনজ ও ফলজ গাছ বন এবং পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ এক ভূমিকা পালন করে চলেছে। শান্তিপুর অরণ্য কুঠিরের অন্যান্য স্থাপনার মধ্যে রয়েছে সুসজ্জিত প্রার্থনার স্থান, মারবিজয়ী উপগুপ্ত মহাস্থবিরের মূর্তি, লাভীশ্রেষ্ঠ সিবলী মহাস্থবিরের মন্দিরসহ মূর্তি, ১০০ হাত দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট ভিক্ষু শালা, ৮০ হাত দৈর্ঘ্যের ভোজনালয়, ৬০ হাত দৈর্ঘ্যের দেশনাঘর, অধ্যক্ষ ভিক্ষুর আবাসস্থল মৈত্রী ভবন, সুদৃশ্য শ্রামনশালা। কুঠিরের প্রতিটি ভাস্কর্যে গৌতম বুদ্ধের জীবদ্দশার বিভিন্ন কাহিনী, উপদেশ এবং অনুপ্রেরণামূলক বাণীও তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও এখানে ২৫টিরও বেশি সাধনা কুঠির এবং উপ কুঠির। প্রত্যেকটি কুঠিরে একজন করে ভিক্ষু ও শ্রামন ধ্যানে মগ্ন থাকেন। বড় মূর্তির পিছনের দিকে ১৩টি কুঠিরে ভান্তেরা সাধনা করেন তাই সেখানে জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ। ধর্মীয় আচার পালনের সুবিধার্থে সকাল ১১টা হতে দুপুর ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত পানছড়ি শান্তিপুর অরণ্য কুঠিরে দর্শনার্থীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া রয়েছে। হিংসা-বিদ্বেষহীন এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটি পানছড়ির শান্তি, সম্প্রীতি এবং সৌহার্দ্য রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা করে চলেছে। প্রতি বছর বৌদ্ধ পূর্ণিমা, আষাঢ়ি এবং প্রবারণা পূর্ণিমাতে এখানে বৌদ্ধ পূজা এবং উৎসবের আয়োজন করা হয়। কঠিন চীবর দানের সময় দেশের নানা স্থান হতে ৫০ হাজারেরও অধিক ভক্ত ও পূন্যার্থীর আগমন ঘটে এই পানছড়ি শান্তিপুর অরণ্য কুঠিরটিতে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে প্রতিদিন এখানে শতাধিক পূণ্যার্থী এবং পর্যটকদের আগমন ঘটে।

রাউজান পাহাড়তলী মহামুনি বৌদ্ধ বিহার

রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী মহামুনি গ্রামে টিলার উপর মহামুনি বৌদ্ধ বিহার (Mahamuni Buddhist Vihara) অবস্থিত। ধারণা করা হয়, ১৮১৩ সালে চাইংগা ঠাকুর নামের এক বৌদ্ধ ধর্মগুরু মহামানব গৌতম বুদ্ধের মূর্তি স্থাপনের মাধ্যমে এই বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। এ কারণে গৌতম বুদ্ধের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখা হয় মহামুনি মন্দির। আবার ড. রামচন্দ্র বড়ুয়া তাঁর ‘চট্টগ্রামের মগের ইতিহাস প্রাগুক্ত’ গ্রন্থে ১৮০৫ সালে মহামুনি বৌদ্ধ বিহারের মন্দির ও মুর্তি নির্মাণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। মহামুনি বৌদ্ধ বিহারের প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও এই স্থাপনাটি প্রায় ২০০ বছরের পুরাতন একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন এ বেপারে কোন সন্দেহ নেই। ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে মং সার্কেল রাজা মহামুনি বৌদ্ধ বিহার চত্বরে চৈত্র মাসের শেষ দিন থেকে এক মেলার প্রবর্তন করেন। যা দেশজুড়ে মহামুনি মেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। তৎকালীন সময়ে অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রচুর দর্শনার্থী মেলায় আগমন করতেন। ঐতিহাসিক মহামুনি বৌদ্ধ বিহারের জন্য বর্তমানে এই গ্রামটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। মহামুনি বৌদ্ধ বিহার দেখতে যেতে চাইলে প্রথমে চট্টগ্রাম আসতে হবে। এরপর চট্টগ্রাম থেকে বাসে কাপ্তাই সড়ক ধরে রাউজান পাহাড়তলী নেমে সিএনজি কিংবা রিকশায় চড়ে মহামুনি বৌদ্ধ বিহার যেতে পারবেন। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম: ঢাকা থেকে সড়ক, রেল এবং আকাশপথে চট্টগ্রাম যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। রাজধানীর সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে সৌদিয়া, ইউনিক, টিআর ট্রাভেলস, গ্রিনলাইন, হানিফ, শ্যামলী, সোহাগ, এস.আলম, মডার্ন লাইন ইত্যাদি বিভিন্ন পরিবহনের এসি/নন-এসি বাস ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করে। আর ট্রেনে চট্টগ্রাম যেতে চাইলে ঢাকার কমলাপুর কিংবা বিমানবন্দর রেলওয়ে ষ্টেশন হতে সোনার বাংলা, সুবর্ন এক্সপ্রেস, তূর্ণা-নিশীথা, মহানগর প্রভাতী/গোধূলী কিংবা চট্রগ্রাম মেইলে যাত্রা করতে পারেন। এছাড়া ঢাকা থেকে বেশকিছু বিমান সংস্থা চট্টগ্রামগামী ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নিতে চাইলে হোটেল জামান থেকে ঘুরে আসতে পারেন। আর মেজবানি খাবারের জন চকবাজারে অবস্থিত “মেজবান হাইলে আইয়্যুন” রেস্তোরার বেশ সুনাম রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম শহরে জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেশকিছু ভালমানের রেস্টুরেন্ট আছে। এদের মধ্যে বারকোড ক্যাফে, মিলেঞ্জ রেস্টুরেন্ট, গ্রিডি গাটস, ক্যাফে ৮৮, সেভেন ডেইজ, ধাবা, হান্ডির নাম, গলফ গার্ডেন রেস্টুরেন্ট, কোষ্টাল মারমেইড রেস্টুরেন্ট এন্ড লাউঞ্জ, বোনানজা পোর্ট রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। কোথায় থাকবেন: চট্টগ্রাম শহরে বিভিন্ন মানের অসংখ্য আবাসিক হোটেল পাবেন। পছন্দমত ও বাজেট অনুযায়ী হোটেল নিতে কয়েকটি হোটেলের খোঁজ নিয়ে যাচাই করে নিন। প‌্যারামাউন্ট, হোটেল অবকাশ, হোটেল লর্ডস ইন, হোটেল এশিয়ান এসআর, হোটেল ল্যান্ডমার্ক ইত্যাদি হোটেলে ৮০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে রাত্রিযাপন করতে পারবেন।

আজ পূজ্য বনভান্তের দশম প্রয়াণ দিবস

আজ পূজ্য বনভান্তের দশম প্রয়াণ দিবস

আজ রবিবার ৩০ জানুয়ারি ২০২২ইংরেজি । রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারের অধ্যক্ষ , পরমপূজ্য শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভান্তের দশম প্রয়াণ বার্ষিকী । ২০১২ সালের ৮ জানুয়ারি অন্যান্যবারের মতো পূজ্য বনভান্তের ৯৩তম জন্মদিন জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্‌যাপিত হয়।

সেবছর বনভান্তের জন্মদিন উপলক্ষে থাইল্যান্ডের ধম্মকায়া ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এবং বনভান্তের শিষ্যসংঘের সার্বিক সহযোগিতায় ২৯৪ জন কুলপুত্রকে প্রব্রজ্যা প্রদান করা হয়। ১১ জানুয়ারি ভোরে পূজ্য ভান্তে তাঁর শিষ্যসংঘকে প্রাত্যহিক ধর্মদেশনা প্রদান করেন। বলা বাহূল্য, এটি ছিল তাঁর শিষ্যসংঘের উদ্দেশে সর্বশেষ ধর্মদেশনা ১৩ জানুয়ারি লে. জেনারেল জগৎ জয়সুরিয়া, কমান্ডার অব দ্য শ্রীলঙ্কান আর্মি, রাজবন বিহার পরিদর্শন করেন এবং ভিজিটরস বইয়ে স্বাক্ষর করেন। ১৫/১৬ জানুয়ারি পূজ্য ভান্তে ঠাণ্ডাজনিত কারণে সামান্য অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি পূজ্য বনভান্তের জ্ঞাতিবর্গ ভান্তের উপস্থিতিতে ‘বনভান্তের বিশ্রামাগার’-এ সংঘদান করেন। এবং তাঁর কনিষ্ট ভ্রাতা জহর লাল-প্রদত্ত সর্বশেষ আহার গ্রহণ করেন। পরদিন হতে পূজ্য ভান্তে সম্পূর্ণ খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করেন—শুধুমাত্র কখনও কখনও সামান্য পরিমাণ কোকাকোলা পানীয় পান করেন। এরপর থেকে ক্রমেই তাঁর অসুস্থতা বাড়তে থাকে। ২৩ জানুয়ারি পূজ্য ভান্তের কনিষ্ঠ ভ্রাতা জওহর লাল চাকমা রাঙামাটি সদর হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ২৬ জানুয়ারি পূজ্য ভান্তের শারীরিক অবস্থা ভীষণভাবে অবনতি হওয়ায় এক জরুরি আলোচনা আহ্বান করা হয়। উক্ত সভায় পূজ্য ভান্তের শিষ্যসংঘ, মেডিকেল বোর্ডের ডাক্তাররা ও চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়সহ উপস্থিত গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক সর্বসম্মতিক্রমে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে রাজধানী ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২৭ জানুয়ারি বেলা ১২:০৮ মিনিটের দিকে পূজ্য ভান্তের শত শত শিষ্য ও হাজারো ভক্ত-অনুরাগী মিলিত হয়ে পূজ্য ভান্তের আশু রোগমুক্তি কামনায় রাঙামাটি সার্কিট হাউসের মাঠে শ্রদ্ধেয় ভান্তেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেওয়া হয়। তার পর ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে সর্বাধুনিক উন্নত চিকিৎসা চলতে থাকে।

উল্লেখ্য, তিনি বিগত বেশ কিছুদিন ধরে ডায়াবেটিস, নিউমোনিয়া, কিডনী ও লিভারের জটিল সমস্যায় ভুগছিলেন। ৩০ জানুয়ারি পরমপূজ্য বনভান্তে শত শত শিষ্য ও লাখো লাখো ভক্ত-অনুরাগীর সনির্বন্ধ প্রার্থনা উপেক্ষা করে ঢাকাস্থ স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩:৫৬ মিনিটে পড়ন্ত বিকেলে প্রয়াণ লাভ করেন। ১৯২০ সালের ৮ জানুয়ারী তিনি রাঙামাটি শহর থেকে দক্ষিণে মগবান মৌজার মোরঘোনা নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। লোকোত্তর সাধক বনভান্তের পবিত্র জন্মভিটাটি এখন আর নেই। কাপ্তাই হ্রদের পানির নিচে তলিয়ে গেছে! পুণ্যার্থী বৌদ্ধ অনুসারীরা বনভান্তের জন্মভিটার স্মৃতিকে জাগ্রত রাখার লক্ষ্যে ওই স্থানে একটি স্তম্ভ তৈরি করেছেন। হ্রদের পানি যখন হ্রাস পায়, তখন ওই স্তম্ভের চূড়া দেখে বনভান্তের জন্মস্থানকে নির্ণয় করা যায়। রাঙামাটি-কাপ্তাই নতুন সড়কের খুব কাছ থেকে এ স্তম্ভ দেখতে পাওয়া যায়।

দশম সংঘরাজ পন্ডিত জ্যোতিপাল মহাথের

দশম সংঘরাজ পন্ডিত জ্যোতিপাল মহাথের

এই উপমহাদেশে ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে এ বঙ্গভূমিতে বাঙালির সমৃদ্ধ ইতিহাস ঐতিহ্য, সাহিত্য সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ধর্মীয় মূল্যবোধকে জাগ্রত করে দেশে- বহির্বিশ্বে শান্তির নির্মল সুবাতাস ছড়িয়ে অসামান্য অবদান রেখেছেন- তাঁদের মধ্যে বিশ্বনাগরিক, একুশেপদক প্রাপ্ত, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাহিত্যিক পণ্ডিত জ্যোতি:পাল মহাথের অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে সুলেখক, গবেষক, দার্শনিক, সাহিত্যিক, বিদর্শন সাধক, পরোপকারী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, মানবতাবদী, থেরবাদী বৌদ্ধদের ১০ম সংঘরাজ, পন্ডিত জ্যোতির্ময় আলোকবর্তিকা, বহু গ্রন্থের প্রণেতা, সুদেশক। এই ক্ষণজন্মা পন্ডিত জ্যোতিঃপাল মহাথেরোর কর্মময় জীবন দর্শন সম্পর্কে এই ক্ষুদ্র পরিসরে বিস্তারিত লেখা সম্ভব নহে। তবুও সুপ্রিয় পাঠকদের জানার সুবিধার্থে এখানে কিঞ্চিত তুলে ধরলাম।

মহামান্য সংঘরাজ পণ্ডিত জ্যোতিঃপাল মহাথের ১৯১৪ সালে কুমিল্লা জেলার লাকসাম থানার কেমতলী বরইগাঁও গ্রামীণ জনপদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯২৬ সালে প্রব্রজিত হন। ১৯৩৮ সালে উপসম্পদা লাভ করেন। তাঁর উপাধ্যায় ছিলেন চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলাস্থ জোবরাপাড়া নিবাসী খ্যাতিমান সাংঘিক ব্যক্তিত্ব উপসংঘরাজ গুনালঙ্কার মহাথের। 

তিনি উপসম্পদা লাভের পর বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনে জ্ঞান লাভের জন্য পালি সাহিত্য চর্চা ও বিদর্শন ধ্যান সাধনা শুরু করেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে – কর্মতত্ত্ব পুগ্‌গল পঞ্‌ঞক্রতি, মালয়েশিয়া ভ্রমণ কাহিনী, বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামে, বোধিচর্যাবতার, সাধনার অন্তরায়, বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা, সৌম্য সাম্যই শান্তির কারণ, প্রজ্ঞাভূমি নির্দেশ, ভারতে বৌদ্ধধর্মের উত্থান পতন, চর্যাপদ, বুদ্ধের জীবন ও বাণী, উপসংখরাজ গুর্ণালংকার মহাস্থবির, রবীন্দ্র সাহিত্যে বৌদ্ধ সংস্কৃতি, ভক্তি শতকম ইত্যাদি। তাঁর কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার, উপাধি ও পদবী। তন্মধ্যে এশীয়ান বুড্ডিস্ট কনফারেন্স ফরপিস কর্তৃক এশীয়া শান্তিপদক, মিয়ানমার সরকার কর্তৃক ‘অগ্‌গমহাসদ্ধম্ম জ্যোতিকাধ্বজ’, সদ্ধর্ম রক্ষায় বিরল অবদানের জন্য বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা কর্তৃক ১৯৭৪ সালে ‘মহাশাসনধর’, উপাধি প্রাপ্ত হন। এছাড়াও আবুরখীল জনকল্যাণ সমিতি কর্তৃক ‘মহাধর্মনিধি’। বিশ্ব শান্তি, প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অবদানের কারণে ১৯৯৫ সালে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংগঠন জাতিসংঘ বিশ্বশান্তি মানবতা ও নিরস্ত্রীকরণের ক্ষেত্রে অমূল্য অবদানের জন্য তাঁকে ‘বিশ্বনাগরিক’ উপাধি প্রদান করেন। এই দুর্লভ উপাধি প্রাপ্তিতে তিনি হয়ে গেলেন বিশ্বজনীন বিশ্বনন্দিত ধর্মগুরু। এই উপাধি দ্বারা তিনি নিজে ও পুরো বাঙালি জাতিকে গর্বিত করেছেন। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে বিশেষ পুরস্কার ‘একুশ পদক’ লাভ করেন। 

এখানে বলাবাহুল্য যে তাঁর কর্ম জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল তিনি একজন সর্বত্যাগী বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হওয়ার পরও মাতৃভূমিকে স্বাধীন করা ও দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তিনি ১৯৭১ সালে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিলেন মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে। তবে অস্ত্র হাতে নয়। উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ভালোবাসা ও একান্ত সান্নিধ্যের কারণে এদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে স্বীকৃতি আদায় করেছিলেন ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, জাপান, কম্বোডিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ভুটান ইত্যাদি বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রে সফর করেছিলেন। জাতির এই ভয়াবহ দুর্দিনে ভারতে আশ্রয় নিয়ে তিনি সেখানে বাঙালি ও ভারতবাসিকে সংগঠিত করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিলেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর দীপ্ত পদচারণায় আমরা আরো দেখতে পাই যে, ১৯৭১ সালে ও পরবর্তীতে যুদ্ধ বিধ্বস্ত স্বদেশ গড়তে ও সদ্বর্মের কল্যাণ সাধনে তিনি একাধিকবার গমন করেছিলেন ভারত, নেপাল, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, চীন, জাপান, মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া, আমেরিকা, কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার ইত্যাদি রাষ্ট্রে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যান্তরে ১৯৮২ সালে ২০ ফেব্রুয়ারি তারিখে বিশ্বশান্তি প্যাগোডা প্রতিষ্ঠা করেন। দৃষ্টি নন্দন, অতি মনোরম, মনোমুগ্ধকর ছায়া সুনিবিড় স্নিগ্ধ সবুজ, শান্ত পরিবেশে এই বিশ্বশান্তি প্যাগোডার অবস্থান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাঁর জীবনাবসান পর্যন্ত দীর্ঘ ২১ টি বছর তিনি এ বিশ্বশান্তি প্যাগোডাতে অবস্থান করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই প্যাগোডায় গত ৩৮ বছরে দেশ ও বিদেশের প্রায় চল্লিশ হাজার কৃতী শিক্ষার্থীবৃন্দ সেখানে অধ্যয়ন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করেন। বর্তমানে এই প্যাগোডায় আবাসিক ছাত্রাবাসে প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছে। এছাড়াও এক জন তত্ত্বাবধায়কসহ ও পরিচালনা পরিষদের কর্মকর্তারা নিয়মিত দেখাশোনা করছেন। এই প্যাগোডাকে ঘিরে বর্তমানে বৌদ্ধজাদি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। সম্প্রতি থ্যাইল্যান্ড থেকে বিশাল দেহী একটি বুদ্ধমূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে প্রতিদিন দেশ বিদেশের অনেক পর্যটকের উপস্থিতিসহ বৌদ্ধধর্মীয় নর-নারীদের পদচারণায় তীর্থ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। এ মহাপুরুষ গত ১২ এপ্রিল ২০০২ সালের পরলোক গমন করেন। 

লেখক : সহকারী শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজ